ব্যবসাবান্ধব বাজেটে জনতার প্রত্যাশা

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ২১:৫১

২০২০-২১ অর্থবছরে ঘোষিত বাজেট নিংসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ঘোষিত সর্বাধিক ব্যবসাবান্ধব বাজেট। করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। রেমিট্যান্স, স্থানীয় চাহিদার বিপরীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পণ্য উত্পাদন ও সরবরাহের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি সচল ছিল। পাশাপাশি, যে কৃষি খাতকে অবহেলা করেছি—তা-ই আমাদের রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করেছে। করপোরেট করের হার হ্রাস করার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প খাত যেমন অটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশলশিল্প, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, আইটি, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, মোবাইল, পোলট্রি শিল্পের বিকাশ, কৃষি যন্ত্রপাতি উত্পাদন ও মোটরসাইকেল শিল্পকে উত্সাহিত করতে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন করসুবিধা। তাছাড়া, আঘোষিত অর্থকে বৈধ করার সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগের পথকে করা হয়েছে সহজ। এমনকি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ইসলামিক বন্ডে কর ছাড়ের সুবিধা উল্লেখ করার মতো। এতে করে সহেজেই বোঝা যাচ্ছে—বিনিয়োগবান্ধব রাজস্বব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে সচেষ্ট।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরবর্তী সময়ে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রপ্তানিনির্ভর শিল্পের উন্নয়ন ও স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত একটি শক্তিশালী শিল্পকাঠামো নির্মাণ করতে বদ্ধ পরিকর। তাই আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করার মতো ব্যবস্থা অনলাইন করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাজেটে এও প্রত্যাশা করা হয়েছে—করোনা-পরবর্তী সময়ে বাজেটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্থনীতিকে চাঙা করতে শিল্পক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামে ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ও বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পাশাপাশি বিদেশফেরত আমাদের শ্রমজীবী মানুষের কাজের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করার আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে; কিন্তু অর্থনীতির চাকা শুধু যোগানের মাধ্যমে নির্ধারণ হয় না। আরো সহজ করে বলতে হয়, শিল্পকারখানায় উত্পাদন বাড়লেই যোগান বাড়বে—এটা স্বাভাবিক; কিন্তু চাহিদা যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, তবে তো উত্পাদিত পণ্য অবিক্রীত থেকে যাবে। এই ধরনের স্থবির অবস্থা কাটাতে কেইনসীয় অর্থনীতিবিদগণের দ্বারস্থ হতে হয়। কেইনসীয় অর্থনীতি অনুযায়ী মন্দা মোকাবিলায় অর্থনীতি চাঙা করা যায় মানুষের চাহিদা সৃষ্টি করে। আর এজন্য মানুষের হাতে প্রচুর টাকা থাকতে হবে। এতে করে সাময়িক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ালেও মানুষের চাহিদা বাড়ায় শিল্পকারখানায় উত্পাদিত পণ্য ভোগের চাহিদা বাড়বে।

বাংলাদেশের রাজস্ব আয় পরোক্ষ করনির্ভর। এ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যা গত বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। এবার আয়কর থেকে মোট রাজস্বের ৩১ দশমিক ৮০ শতাংশ, ভ্যাট থেকে ৩৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, আমদানি শুল্ক থেকে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ রাজস্ব আদায় করা হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিগত বছরের মতো এবারও প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব আহরিত হবে। স্বাভাবিকভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের আয় থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরিত হবে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথম বারের মতো ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর অনেক বছর পর বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করহারের সর্বনিম্ন স্ল্যাব বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়। ২০১৫-১৬ থেকে যদি প্রতি বছর গড়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি বা ডিপ্রিসিয়েশন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপর যোগ হয়, তবে তা ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়। এই বাস্তবতায় ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের স্ল্যাব ৩ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে অন্তত ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা যেত পারত করোনকালে মানুষে আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের সর্বনিম্ন স্ল্যাব ৫ লাখ টাকা। একজন মধ্যবিত্ত যাদের আয় ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা প্রতি মাসে, তারা প্রতি বছর যে টাকা আয় করেন—তার বাড়ি ভাড়া ও থাকা-খাওয়ার জন্য খরচ করে ফেলেন মোট ৭০ শতাংশ টাকা। আর অবশিষ্ট ২০ শতাংশ বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ এবং সঞ্চয়ের জন্য তার ১০ শতাংশ টাকার অবশিষ্ট থাকে না বাংলাদেশের শহরগুলোতে। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আবার করেনাকালের লকডাউন থেকে শাটডাউনে যাওয়ার পর এই ঈদে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হবে অনেক মধ্যবিত্ত।

গ্রামীণ আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যাতে করোনার প্রতিঘাত কাটিয়ে উঠিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি দাঁড়িয়ে যায়। পাশাপাশি কৃষি খাতে প্রথম বারের মতো বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার রিফিন্যান্সিং স্কিম চালু করা এবং পল্লি সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কম সুদে গ্রামের মানুষ ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে সামাজিক নিরাপত্তা, কাজের বিনিময় খাদ্য ও দুস্থ মানুষকে খাদ্যসহায়তা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার এ বছর ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে যার মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যসহায়তা বাবদ ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা বিগত বছরের তুলনায় মাত্র ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি। এমনকি খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মোট বাজেট বরাদ্দ বিগত বছরের প্রাক্কলিত বাজেটের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

পিপিআরসি ও বিআইজিডির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে—দেশে মোট ২ দশমিক ৪৫ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এমনকি বিশ্বব্যাংক বলেছে—করোনার কারণে নতুন করে ১ কোটি ৬০ লাখ লোক দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীতে প্রকৃত দরিদ্র্য মানুষের অন্তর্ভুক্তি ১ কোটি ২০ লাখ করার জন্য যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকারকে নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দারিদ্রের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার আশা প্রকাশ করেছে। তাই  এই দারিদ্রের হার হ্রাস করতে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, চর উন্নয়ন প্রকল্প ও খাদ্যসহায়তাসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। দুস্থ, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে যদি নগদ অর্থসহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায় বা অর্থসহায়তার পরিমাণ বাড়ানো যায়—তবেই ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের অর্থনীতি। এটাই সাধারণ জনতার প্রত্যাশ। আশা করি সংশোধিত বাজেটে এই বিষয়গুলোর গুরুত্বারোপ করা হবে এবং বাজেটের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহূত হচ্ছে কি না—তার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থাও থাকবে।

n লেখক :রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বাংলাদেশ ফরেইন ট্রেড ইনস্টিটিউট