নজরদারির অভাবে ও যথাযথ রক্ষনাবেক্ষণ না করায় মগবাজারের মতো ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে এবং শহরের সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ভবিষ্যতেও এরকম দুর্ঘটনার আশংকা করা হচ্ছে।
নগরীতে কয়েকটি সেবামূলক সংস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে কারো সঙ্গে কারো সমন্বয় নেই যার ফলে দুর্ভোগে পড়তে হয় ঢাকার মতো মেগাসিটির বাসিন্দাদের। তিতাস গ্যাস নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস সংযোগ দেয়। দেখা যায়, সেখানেই আবার খোঁড়াখুড়িতে ব্যস্ত থাকে ওয়াসা। এরপর হয়তো কাজ শুরু করে বিদ্যুত্ বিভাগ। সিটি করপোরেশনও আবার আলাদাভাবে তাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে। একইভাবে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসও। এই সমন্বয়হীনতার কারণেই ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। আর এতে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ ও নিরাপরাধ মানুষের। তারপরও ধরােঁছায়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এসব দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিরা। দুর্ঘটনার পর দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তা খুব কমই আলোর মুখ দেখে। এমনকি কমিটির সুপারিশগুলোও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেগুলোর কতোটা বাস্তবায়ন হয় তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ঘটনার পর সেবামূলক সংস্থাগুলো একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েই দায় সারে। রবিবার রাতে রাজধানীর মগবাজারের একটি তিন তলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে পর এর মূল কারণ সম্পর্কে গতকাল সোমবার পর্যন্ত কোনো সেবামূলক সংস্থাই দায় নেয়নি।
এ ব্যাপারে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. আবুল হাসনাত বলেন, মগবাজারে বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত জমে থাকা গ্যাস থেকে। ভবনের নিচতলায় রেস্টুরেন্টে রান্নার কাজে ব্যবহূত এলপিজি সিলিন্ডারের রিফিলের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে। রুমের ফলস সিলিংয়েও গ্যাস জমে থাকে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা রান্নাঘর হওয়ায় জমে থাকা গ্যাস বাইরে বের হতে পারেনি। ধীরে ধীরে ফলস সিলিংয়ে জমে থাকা গ্যাসের পরিমান বেড়ে যায়। পরবর্তীতে জমে থাকা গ্যাস কোনোভাবে বিদ্যুত্ বা আগুনের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রচন্ডভাবে বিস্ফোরিত হয়।
২০১৯ সালে দেশে প্রায় ৮০টি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ-দুর্ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হন। এর বাইরে অনেকে গুরুতর আহতও হন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে চলতি বছরের ৮ মার্চ এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে বিস্ফোরণে মারা যান চারজন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে গত ১১ মার্চ একটি বাসের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনে পুড়ে মারা যান দুই জন। এর আগে ২২ জানুয়ারি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন তিন জন। ১১ জানুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটায় একটি বরফকলে অ্যামোনিয়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজনের প্রাণ যায়।
এ প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দোকানে দোকানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি বড় সমস্যা তৈরি করছে। এই খুচরা বিক্রেতাদের অধিকাংশই সঠিকভাবে সিলিন্ডার সংরক্ষণ করেন না। এটি বন্ধ করা জরুরি। কেননা খুচরা মুদি দোকানদারদের কাছে থাকা সিলিন্ডারগুলো মৃদু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা তারা বুঝতে পারেন না। এই ক্ষুদ্র লিকেজ-ত্রুটিই গ্রাহক পর্যায়ে বড় দূর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, খুচরা বিক্রি বা গ্রাহক পর্যায়ে এগুলো দেখভালের দায়িত্ব আমাদের কর্মপরিধিতে নেই। সে জনশক্তিও আমাদের নেই। আমরা মজুতদারদের লাইসেন্স প্রদান করি, খুচরা পর্যায়ে নয়। এলপিসহ সিলিন্ডার যারা বিক্রি করছেন সে কোম্পানিগুলোর উচিত এর তদারকি, সচেতনতা এবং বিক্রয় পরবর্তী সেবা প্রদান করা।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে প্রায় ২শ’ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় দেড়শ’ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি মসজিদে নামাজ পড়ার সময় বিস্ফোরণে ৩৬ মুসল্লী নিহত হন। মসজিদের পাশ দিয়ে তিতাস গ্যাসের লাইন লিকেজ হয়ে মসজিদের ভিতরে গ্যাস জমে যায়। সেটা থেকেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। যদিও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে তাদের দায় অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সিটি কর্পোরেশন। একেকটি ঘটনার পরপর কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠলেও ২/১ দিন পর তা থেমে যায়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় আবারো কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে ৭৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ গত ২৩ এপ্রিল আরমানিটোলায় একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীসহ ৪ জনের প্রাণ যায়। রাজধানীতে প্রায়ই ঘটছে গ্যাস লাইনের সংযোগ থেকে বিস্ফোরণ। কখনও রাস্তায় সঞ্চালন লাইন থেকে বিস্ফোরণ হচ্ছে, আবার কখনও বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আসাদ গেটের আড়ং মোড়ে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দু’টি গাড়িতে আগুন লাগে। একই বছরের ২৩ জুলাই রাজধানীর বংশাল কসাইটুলির দোতলা বাড়ির নিচতলায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। উত্তরখানের ব্যাপারীপাড়ায় একটি বাসায় গ্যাস লাইনের লিকেজে আগুন লেগে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু হয়।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নূরুল্লাহ বলেন, তিতাসের পুরনো কিছু লাইন রয়েছে এবং তা পুন:স্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনায় সে ধরণের কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই। তিনি জানান, তিতাসের সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষন করা হয়। গ্রাহক অভিযোগ জানালে বাসার ভেতরে গিয়েও সংযোগ পরীক্ষা করা হয়।
তিতাস গ্যাসের পাশাপাশি রাজধানীতে রাস্তায় খোঁড়াখুড়ির কাজ করে ওয়াসা। বছর ধরেই চলে ওয়াসার পুরাতন ড্রেনের সংস্কার কাজ। ছোট ড্রেন বাতিল করে দিয়ে সেখানে বড় ড্রেন স্থাপন করার সময় প্রায়ই গ্যাস লাইন, বিদ্যুত লাইন বা টেলিফোন লাইন কেটে যায়। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ নগরবাসীকে। সেবামূলক সংস্থাগুলো নিজেদের মত করে বছর ধরে উন্নয়নের কাজ করে থাকে। মগবাজারে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের স্থানের সামনের রাস্তায় ওয়াসার ড্রেন নির্মানের কাজ চলছে। ভবনের সামনে অন্তত ৬ ফুট গভীর করে গোলাকার ড্রেন স্থাপন করা হয়েছে। খোঁড়াখুড়ির কারণে সেখানে বিদ্যুত লাইন, গ্যাস লাইন ও টেলিফোন লাইনও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ ব্যাপারে ওয়াসার মগবাজার মডস জোন-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাসা-বাড়িতে বিদ্যুত্ সংযোগ থেকে শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকা্লের ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মগবাজারের দিলু রোডের একটি ভবনে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে শিশুসহ তিনজন মারা যায়। গত বছর সারাদেশে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকা্লে প্রাণহানি ঘটেছে ১৮৬ জনের।
এ ব্যাপারে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আমীর আলী বলেন, যে কোনো একটি ভবনে বিদ্যুত সংযোগ দেওয়ার আগে সেটি তদন্ত ও পরিদর্শন করা হয়। বিদ্যুত সংযোগ দেওয়ার পর সেটির কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না তাও একটি পরিদর্শন টিম তদন্ত করে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, একটি ভবনে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রয়েছে কি না তা ফায়ার সার্ভিস যথাযথ তদন্ত করেই রিপোর্ট দেয়। তবে একটি ভবনে গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংযোগের বিষয়ে সমন্বয় করা গেলে কাজটি ভাল হতো। কিন্তু সেটি করতে গেলে তো নিজের কাজটিই সঠিকভাবে হবে না। তাই ফায়ার সার্ভিস তার নিজ কাজটি যথাযথভাবে পালন করছে।
