সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা?

আপডেট : ২৯ জুন ২০২১, ২০:৫৪

হাতি আছে; কিন্তু তাহার মাহুত নাই। গাড়ি আছে; কিন্তু চালক নাই। এই সমস্যা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে সবচাইতে প্রকটভাবে দেখা যায়। সম্প্রতি বত্সরগুলিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিবিধ দুর্নীতি ও নানাবিধ অপচয়ের অসংখ্য খবর প্রকাশিত হইয়াছে। অবকাঠামো-সংকট, ঔষধসংকট, চিকিত্সক ও অন্য জনবলসংকট, চিকিত্সাসেবার জন্য প্রয়োজন—এমন যন্ত্রপাতির সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা প্রায়শই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কোথাও দেখা যায়, সরকার সি-অ্যাম্বুলেন্স দিয়াছে; কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সটির চালক দেয় নাই। উহার জ্বালানিরও বরাদ্দ নাই। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি যে, বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নানান সময় কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছে; কিন্তু ঐ সকল যন্ত্রপাতির জন্য কোনো অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। অর্থাত্ বহু মূল্য দিয়া তেজি ঘোড়া ক্রয় করা হইয়াছে; কিন্তু ঘোড়া পরিচালনার জন্য নগণ্য মূল্যের সামান্য ‘চাবুক’ ক্রয় করা হয় নাই। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই। তাহা হইলে সমস্যাটি কোথায়?

দুঃখের সহিত বলিতে হয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র ক্রয়ের নীরব দুর্নীতির মহোত্সব লক্ষ করা যায়। এইভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করিয়া ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির অধিকাংশ অকেজো হইয়া পড়িয়া থাকে। এমনকি অনেক যন্ত্রপাতির প্যাকেটও খোলা হয় না। এই সকল ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে তদন্ত কমিটি গঠনের উদাহরণ প্রায়শই দেখা যায়; কিন্তু তাহার পরও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম দূর হয় না। উহা যেন সুদূরপরাহত কাজ। শুধু স্বাস্থ্য খাতই নহে, বিভিন্ন স্তরেই আমরা এই অনিয়মের বাড়াবাড়ি দেখিতে পাই। অনেকেই বলিয়া থাকেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এখন আর কোনো স্বপ্ন নহে। কেহ কেহ আরো খানিকটা অগ্রসর হইয়া বলেন—উন্নয়নের সকল সোপান এখন এক এক করিয়া বাস্তবায়িত হইতেছে। অথচ সরকারের উন্নয়ন ও অবকাঠামো-সংক্রান্ত কাজের নিম্নমান লইয়া শত শত খবর প্রতি বত্সর ছাপা হয়। ইতিপূর্বে একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের অনুকূলে পল্লি-অবকাঠামো উন্নয়নে যেই সকল কাজ করা হইয়াছে, তাহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরই মান খারাপ। উপরন্তু কাজ সম্পন্ন করা এবং কাজের বিল দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে রহিয়াছে কমিশন বাণিজ্য। ইহা ছাড়াও, সমগ্র দেশে উন্নয়নের জন্য যেই সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহার বৃহত্ একটি অংশ অসম্পন্নই থাকিয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে যেইটুকু কাজ সম্পন্ন হয়, সেইটুকুও বহুলাংশে মানসম্পন্ন হয় না। মতলবাজরা দোষ দেয় বিটুমিনের, ইট-বালি-খোয়া প্রভৃতি উপকরণের মানের। এমনকি যেই ঠিকাদার কাজটি পাইয়াছেন, তিনি অন্য কাহারো নিকট কাজটি বিক্রয় করিয়া দিয়াছেন বলিয়া কাজটির মান খারাপ হইবার অজুহাতও শুনা যায়। আর সকল কিছুর ঊর্ধ্বে যাহারা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন—তাহারা কি ধোয়া তুলসীপাতা? তাহারা কেন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সকল কিছু বুঝিয়া নেয় নাই? আবার রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পর উহার নিয়মিত সংস্কার করা না হইলে কয়েক বত্সর পর উহারা ব্যবহার অনুপযোগী হইয়া পড়ে। নিয়মিত সংস্কার ব্যতীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যে বৃথা হইয়া যায়, এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটিতে প্রবল অবহেলার ছাপ দৃশ্যমান; কিন্তু কেন এই রকম হইবে? অবস্থা এমন যে, সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা?

সকল ধরনের উন্নয়নকাজ তদারকির জন্য সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা রহিয়াছেন। স্থানীয় পর্যায়ে নানা স্তরে আমাদের জনপ্রতিনিধিও রহিয়াছেন। একেবারে তৃণমূল ইউনিয়ন পর্যায়ে রহিয়াছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ। তাহার পরও সরকারি কাজ ঠিকমতো না হইবার কারণ কী? আমরা আশা করিব, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাস্তব-বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নকাজের যে কোনো সমস্যার সহজ সমাধান করিবেন।