জেনেভা সংলাপের সাফল্য-ব্যর্থতা

আপডেট : ২৯ জুন ২০২১, ২১:০২

ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা ও রাশিয়ান ফেডারেশনের শীর্ষ নেতাদ্বয়ের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত জেনেভা সংলাপ অবশেষে সম্পন্ন হলো। কঠোর নিরাপত্তা-বেষ্টনীর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো-বাইডেন ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৬ জুন সুইজাল্যান্ডের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় নিজ নিজ প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠকস্থলে উপস্থিত হন। নিরপেক্ষ স্বাগতিক দেশ সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট দুই নেতাকে সঙ্গে নিয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেওয়ার পর শুরু হয় পুতিন-বাইডেন সংলাপের আনুষ্ঠানিকতা। তবে বরাদ্দ সময় পাঁচ ঘণ্টা শেষ হওয়ার কিছু আগেই তিন দফায় অনুষ্ঠেয় আলোচনার সমাপ্তি টেনে দুই নেতা সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হন। অন্যদিকে জেনেভা সংলাপকে কার্যকর ও ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতির সূত্র ধরে অগ্রগতির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা যায়। ঐ সূত্র ধরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সংলাপে দুই নেতাই নিজ নিজ রাষ্ট্রদূতদের মস্কো ও ওয়াশিংটনে ফেরার তাগিদ অনুভব করেছেন। ইতিমধ্যে আমেরিকা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতদ্বয় যথাক্রমে মস্কো-ওয়াশিংটনে কাজে যোগ দিয়েছেন। ফলে রুশ-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় কাজে আবার গতিশীলতা ফিরে আসবে বলেই ধরে নেওয়া যাচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, বেশ কয়েক মাস থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মস্কো ও ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাশিয়া ও আমেরিকার রাষ্ট্রদূতরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। ঐ সময়ে রাষ্ট্রদূতদ্বয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সৃষ্ট বিরূপ পরিস্থিতি এড়ানোর লক্ষ্যে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে নিজ নিজ সরকারের সঙ্গে অধিকতর আলোচনার উদ্দেশ্যে নিজ দেশে অবস্থান করছিলেন। শীর্ষ কর্তাদের এরকম অনির্ধারিত ছুটির কারণে কার্যত মস্কো ও ওয়াশিংটনে অবস্থিত রাশিয়া ও আমেরিকার কূটনৈতিক মিশনের যাবতীয় কাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়া দুই পরাশক্তির জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাই রাষ্ট্রদূতদের দ্রুত কাজে ফেরানোর ব্যাপারে উভয় নেতার প্রাথমিক সম্মতি কার্যকর প্রতিফলন ঘটায় শিগিগর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থবিরতা কেটে যাবে। অন্যদিকে দুই নেতার সংলাপে যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন সেটি হচ্ছে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারসংক্রান্ত ঝুঁকি কমিয়ে নিয়ে আসা। এ লক্ষ্য পূরণে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার তাগিদ অনুভব করেছে উভয় প্রেসিডেন্ট।

উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র। বেশ কয়েক বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিস্তার ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে রুশ-মার্কিন সামরিক উত্তেজনা রয়েছে তুঙ্গে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের আশঙ্কা বহুলভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের মিত্রদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উত্কণ্ঠাও ক্রমবর্ধনশীল। সংগত কারণেই যে কোনো পরিস্থিতিতেই পরমাণু যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার পূর্বতন সমঝোতা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা। এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত খোলামেলাভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। বাইডেন-পুতিন দুজনেই পরমাণু যুদ্ধের ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেছেন—এই যুদ্ধে কারোরই জয়ী হওয়ার সুযোগ নেই। তাই এর বিভীষিকা থেকে পরিত্রাণ পেতে যে কোনো মূল্যে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতিতে আমরা অটল থাকব। এটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক সংবাদ। বলা চলে, জেনেভা আলোচনায় এটিই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। দুই পরাশক্তির এই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই বাকি বিশ্বের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাও কমাতে সহায়তা করবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুই নেতা কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার কমিয়ে আনার ব্যাপারেও প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছেন। এই লক্ষ্য পূরণে স্টার্ট চুক্তির অচলাবস্থা নিরসনে পুনরায় দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করার ইঙ্গিত মিলেছে যৌথ বিবৃতিতে। উল্লেখ্য, স্টার্ট চুক্তির আওতায় উভয় দেশই কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের উন্নত যুদ্ধযান কমিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এই চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আইনগত ভিত্তি আলগা হয়ে পড়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্র প্রতিযোগিতা অব্যাহতভাবে বেড়েই যাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে। ঐ আলোকেই সিরিয়া ও ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনায় পরমাণু ঝুঁকির ব্যাপারটি সবারই চিন্তার কারণ হয়ে আছে। সংগত কারণেই সামগ্রিক পরমাণু ঝুঁকি কমানোর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য পূরণে এই আলোচনা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই বোধগম্য হচ্ছে। কেননা স্টার্ট চুক্তির অচলাবস্থা নিরসনে দ্বিপক্ষীয় সংলাপ শুরুর ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় চুক্তিটি নবায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় রুশ-মার্কিন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি জোরদার হতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কর্মকৌশলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক সামরিক উত্তাপ কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। সংগত কারণেই এই মতৈক্য সংলাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রদূতদ্বয়ের কাজে যোগ দেওয়ার মতো দ্রুতই স্টার্ট চুক্তি নবায়নের ব্যাপারেও দুই দেশ কার্যকর আলোচনা শুরু করবে বলেই সবাই আশাবাদী।   

অন্যদিকে ইরানের পরমাণু চুক্তির মতো বিষয়গুলো সংলাপে গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিতে আমেরিকার নিঃশর্ত ফেরার আন্তর্জাতিক আহ্বানের প্রতি-উত্তরে বাইডেন কোনো আশার বাণী দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃষ্টিগ্রাহ্য না হওয়াটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কেননা বিশ্বের সামগ্রিক পরমাণুঝুঁকি কমাতে হলে ইরানের পরমাণু চুক্তি টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমেরিকা একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নতুন করে বেগবান হয়েছে। এই অবস্থায় যে কোনো মুহূর্তেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তার দায় কার ওপর বর্তাবে? যদিও দুই নেতাই ইরান পরমাণু চুক্তি টিকিয়ে রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

এছাড়াও আমেরিকার পক্ষ থেকে বন্দি বিনিময়, সাইবার নিরাপত্তা ইস্যুকে আলোচনায় টেনে আনা হলেও সেগুলো বেশিদূর অগ্রসর হয়েছে বলে স্পষ্ট হওয়া যাচ্ছে না। যদিও এই ইস্যুগুলো স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়াতেই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। অন্যদিকে সিরিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতেও দুই নেতা আলাপ সেরেছেন বলে জানা গেছে। তবে রুশ মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিরিয়া ও ইউক্রেন অত্যন্ত জটিল ইস্যু। কেননা এর সঙ্গে উভয় দেশেরই নিরাপত্তাগত সংশ্লিষ্টতা বিস্তৃতভাবে জড়িয়ে আছে। রুশ-মার্কিন সম্পর্কের চলমান বাস্তবতা থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, সিরিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানই চলমান রুশ-মার্কিন উত্তেজনার অনুঘটক। এ কথা বলাই বাহুল্য, সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার ভূমিকায় আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অনেকটাই বেকায়দায় পড়েছে। যদিও ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় যে এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে বেকায়দায় ফেলতে আমেরিকা রুশ সীমান্তসংলগ্ন ইউরোপীয় দেশগুলোতে নানামুখী কূটনৈটিক সামরিক ছক আঁটছেন। এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ধরে রাখা রাশিয়ার কাছ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিজ সীমান্তসংলগ্ন ইউক্রেনের সঙ্গে আমেরিকার নতুন সখ্যকে ভণ্ডুল করার সর্বতো লক্ষ নিয়ে কাজ করছে রাশিয়া।

গত কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করেই কার্যত রুশ-মার্কিন সম্পর্ক টালমাটাল। যে কারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে জেনেভা সংলাপে মতৈক্য সৃষ্টি হওয়া বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা। এতে করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাড়তি উত্তেজনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে সংযুক্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ঝুঁকি কমাতে একধরনের আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু সংলাপের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে এই আলোচনা শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হতে পারে। তবে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের কর্মস্থলে যোগ দেওয়াটাই জেনেভা সংলাপের প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার চলমান প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে যে কোনো মুহূর্তেই। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রুশ-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অধিকতরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকি বরাবরই আছে। তাই জেনেভা সংলাপের ক্ষীণ সাফল্যটুকুও ধরে রাখতে মতৈক্য হওয়া বিষয়গুলোর দ্রুত বাস্তবায়নই প্রাসঙ্গিক। পরবর্তী সময়ে ঐ ভিত্তিতেই জেনেভা সংলাপের সাফল্য ব্যর্থতা নিরূপণ করা সহজ হবে। 

n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা