খুলনায় হাসপাতালে ঠাঁই নেই, শনাক্তে ফের রেকর্ড

আপডেট : ২৯ জুন ২০২১, ২৩:০৭

দেশের করোনা পরিস্থিতি এখনো অবনতির দিকে। সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা। রাজধানীর বাইরে খুলনার অবস্থা বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। খুলনায় করোনা হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নেই অবস্থা। সেখানে করোনা শনাক্তে নতুন রেকর্ড হয়েছে। এর বাইরে বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, বাগেরহাটে সংক্রমণ বাড়ছে প্রতিদিনই। অন্যান্য জেলাসমূহেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

খুলনা : খুলনার দুটি করোনা হাসপাতালে রোগীতে ঠাসাঠাসি অবস্থা।  ফলে চিকিত্সা পেতে রোগীদের নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও মিলছে না প্রয়োজনীয় বেড। রয়েছে অক্সিজেন সংকটও। ফল চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনায় করোনা রোগীদের চিকিত্সার জন্য সরকারিভাবে দুটি হাসপাতালে করোনা ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালিত ‘১৩০ শয্যার ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল’ এবং অপরটি জেনারেল হাসপাতাল পরিচালিত ‘৭০ শয্যার করোনা ইউনিট’। দুটি মিলে মোট শয্যা সংখ্যা ২০০টি।

খুলনা বিভাগে করোনা ভাইরাসে এক দিনে দ্বিতীয় বারের মতো সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে বিভাগে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে রেকর্ড ১ হাজার ৩৬৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৭১টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গতকাল মঙ্গলবার

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

বরিশাল :বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি এবং মৃত্যুর হার বেড়েছে। একই সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজের আরটি-পিসিআর ল্যাবে বেড়েছে করোনা শনাক্তের হার। এই অবস্থাকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালেনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সোমবার দুপুর ১টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় শের-ই বাংলা মেডিক্যালের করোনা ওয়ার্ডে ১০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের করোনা তথ্য সংরক্ষক। বরিশাল বিভাগে গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

সিলেট :সিলেট বিভাগে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় আরো এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ২৫৮ জন। যার মধ্যে ১৩৪ জনই সিলেটের। একই সময়ে চিকিত্সা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১১৪ জন। গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত ১৪ মাসে সিলেট বিভাগে করোনায় ৪৬৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন সিলেট জেলায়। এ জেলায় করোনায় ৩৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাগেরহাট : বাগেরহাট জেলায় সোমাবার নতুন করে ২২৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১১৬ জন।  জেলায় করোনা শনাক্তের গড় হার ৪৬.৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫১.৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নমুনা পরীক্ষায় করোনার উচ্চ সংক্রমণ হার অব্যাহত থাকায় মঙ্গলবার সংক্রমণ হার সর্বনিম্ন শরণখোলায় ৩১. ৫৭ শতাংশ থেকে সর্ব্বোচ রামপালে ১০০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া পাঁচ জনের মধ্যে বাগেরহাট সদরে তিন জন, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় এক জনের মৃত্যু হয়েছে।

রংপুর : রংপুর বিভাগে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। এ পর্যন্ত সংক্রমণ এবং মৃত্যুর শীর্েষ অবস্থান করছে দিনাজপুর, রংপুর এবং ঠাকুরগাঁও জেলা।গতকাল মঙ্গলবার এই বিভাগে সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন করে ৮ জেলায় ৪৬৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে দিনাজপুরে এক জন এবং ঠাকুরগাঁও জেলায় ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ২০২ জন। এ নিয়ে বিভাগে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে মোট ২৫ হাজার ৫০৭ জন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৬৯৩ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন।

বগুড়া : বগুড়ায় গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনা আক্রান্ত পাঁচ নারীসহ সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জেলায় ৩৬৮টি নমুনা পরীক্ষায় ১৫২ জন করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩ হাজার ৭১২ জন। নতুন সাত জনের মৃত্যু নিয়ে জেলায় মৃত্যু সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৬ জনে। মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন। ডা. তুহিন বলেন, নতুন শনাক্তদের মধ্যে সদর উপজেলার রয়েছেন ১০০ জন।  জেলায় করোনা শনাক্তের হার ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বরিশালের আগৈলঝাড়ায় করোনার দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরেও বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ গত ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৯ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এ নিয়ে আক্রান্তর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ জনে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ সহিদুল ইসলাম জানান, সোমবার ১৬ জনের করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় চার জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

করোনা আক্রান্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করেছেন। সর্বশেষ গত ৩ মে টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেন। তিনি আরও বলেন, তার মতো আরেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক (অব.) লিয়াকত আলী হাওলাদারও করোনার দুটি ডোজ সম্পন্ন করেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে বরিশালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরেও আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএইফপিও) ডা. বখতিয়ার আল মামুন বলেন, টিকা গ্রহণের পরে কেউ আক্রান্ত হবেন না, এমন বিষয় নয়।

নাজিরপুর (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, পিরোজপুরের নাজিরপুরে প্রতি ঘরে ঘরে বাড়ছে জ্বরের রোগীর প্রাদুর্ভাব। করোনা আতঙ্কে বেশির ভাগ লোকজন যাচ্ছে না হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে।  আশঙ্কাজনক হারে জ্বরের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জনসাধারণের মধ্যে করোনার ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে। সর্দি, জ্বর, কাশি, ও গলাব্যথা নিয়ে  যিনিই  পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন, দেখা যায় তিনিই করোনা আক্রান্ত। করোনা আক্রান্তের ভয়ে অনেকেই ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বাড়িতেই গোপনে নিজের মতো করে চিকিত্সা নিচ্ছেন।

এর বাইরে নড়াইল, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, নেত্রকোনা, নাটোর, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), মেহেরপুর, লালমনিরহাট, নোয়াখালী প্রভৃতি জেলা ও উপজেলা থেকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এবং মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।