সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব ও জাপানের অভিজ্ঞতা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১৮

গল্পটা অনেকদিনের পুরনো, তবুও বলছি। নতুন একটি টেবিলের ড্রয়ারকে তালাবন্ধ করার বিষয় নিয়ে। এটা আমার বিদেশের ছাত্রজীবনের এক বাস্তব অভিজ্ঞতাও বলা যায়। জাপানে পড়াশুনা করতে গেলে আমাকে প্রথমদিকে একটি বড় গবেষণাকক্ষ ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। গবেষণাকক্ষে ঢোকার জন্য বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করতো। সবার জন্য পৃথক কম্পিউটার টেবিল ও টেবিলে একটা করে বড় ড্রয়ার ছিল। চাবি ভেতরে রাখা ছিল। সপ্তাহ খানেক পর আমি আমার ড্রয়ারে কিছু জিনিস রেখে তালাবন্ধ করে দিই। একদিন হঠাত্ এক জাপানিজ সহপাঠী বলল- তোমাদের দেশে কি সিস্টেম তা তো জানি না, আমাদের এখানে কিন্তু একই কক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে না বলে কেউ কারো জিনিস কেউ স্পর্শ করি না। তাই নিজের ড্রয়ারেও তালাচাবি লাগানোর নিয়ম নেই। আর হ্যাঁ, একই জায়গায় অবস্থানের সময় নিজের কোনো কিছু তালাবদ্ধ করার অর্থ অন্যকে সন্দেহ করা বুঝায়!

ওর কথা শুনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম!  ভাবলাম এই মূল্যবান সংস্কৃৃতি ওরা তিলে তিলে তৈরি করে আজ অনেক উপরে উঠে গেছে। পরে দেখেছি ওদের অনেকের ঘরের দেয়াল শুধু কাঁচের, গ্রিল নেই। ওরা অনেকে বাড়ির দরজাতেও তালা দেয় না। আর আমরা কোথায় যেন পড়ে আছি। পরে আমাদের দেশে তালাচাবি ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং আমাদের সমাজে ব্যাপক চোর, ডাকাত, জালিয়াত, প্রতারক সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে এমন ভাবনা আমাকে বেশ লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। নিজের জিনিসে তালা দিলে অপরকে অহেতুক সন্দেহ করা হয় এবং অপরের মনে কষ্ট দেয়া হয় এরূপ ধারণা কোন সমাজের মানুষের মধ্যে আছে তা বুঝতে পেরে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়েছিল। ভাবলাম-আমরা গরীব দেশের মানুষ এবং ব্যাপক দুর্নীতি থাকায় ঘরে-বাইরে মনের সন্দেহ নিয়ে তালাচাবি ব্যবহার করি। তালাচাবি লাগানো নিয়ে বিদেশি সহপাঠীদের কৌতূহল সেদিন আমাকে কিছুটা অবাক করলেও ওদের সামাজিক আদবের মর্যাদা বুঝতে পেরে অনেকটা বিমোহিত হয়েছিলাম! পাশাপাশি আমাদের সমাজে কেন এতো বৈপরিত্য, কেন দুর্নীতি-জালিয়াতি, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, প্রতারণা, বৈষম্য- এতো ময়লা-আবর্জনা জমে উঠেছে তার কথা ভেবে মনে কষ্ট পাই।

এজন্য সমাজ বা রাষ্ট্র মোটেও দায়ী নয়। সমাজের নিচু স্তরের খেটে খাওয়া মানুষেরাও তেমন দায়ী নয়। দায়ী হলো আমাদের সমাজের উঁচু শ্রেণির ধ্বজাধারী কিছু স্বার্থপর, পদলোভী মানুষের অনৈতিক তথা মন্দ কৃতকর্মগুলো। তারা সবসময় নিজেদের প্রয়োজনে  ও অর্থবিত্তের লিপ্সায় সমাজের মানুষের ভালো আবেগ, চিরায়ত সুস্থ বিশ্বাস, আস্থা, চাওয়া-পাওয়াকে টুঁটি চেপে ধরে মেরে ফেলছেন। দুর্নীতি-জালিয়াতি, চুরি-ঘুষ ইত্যাদির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ তাদের মন-মননশীলতা মেরে ফেলেছে, মেজাজকে হেঁয়ালি করে তুলেছে। তাদের অবস্থা শুধু চাই আর চাই। ফলে ক্রমান্বয়ে অর্থের কাছে ক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ পরাজিত হয়ে পড়েছে। যেভাবেই অর্জিত হোক সমাজে অর্থবানরাই বেশি ক্ষমতাবান। তাদের এই অর্থের উত্স নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন করে না। এরা কারো চাওয়া-পাওয়া বা অভিযোগকেও পাত্তা দেয় না। বারবার অন্যায় করেও সেই অন্যায়কে ঢাকতে ও রুখতে আরো বেশি অন্যায় করার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

যে সকল অফিসের বসেদর এই রমরমা ঘুষ বাণিজ্য চলে সেখানে কর্মচারীরাও বেশ বেপরোয়া। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ অর্থের সংবাদগুলো দেখে তা সহজেই অনুমেয়। কর্মচারীদের ঘুষের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে একজন কর্মচারী রেগে মেগে সদর্পে বলল- ‘বস ডাকাতি করে আর আমি চুরি করলে দোষের কী দেখলেন?’

দেশে এখনও তিন কোটি হতদরিদ্র মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। অথচ, অতি ধনী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে ফুলে উঠছে! অর্থনীতির ব্যাখ্যায় এই বেড়ে উঠার প্রবণতা অস্বাভাবিক এবং অকল্যাণকর। কারণ সামাজিক বৈষম্য এদের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এরা চারদিকে অসাম্য সৃষ্টি করে সমাজকে কলুষিত হতে শেখায়। লোভ, ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, ক্ষমতা লিপ্সা ইত্যাদি থেকে মানুষের মনে ময়লা জমে। মনের মধ্যে ময়লা জমতে জমতে একসময় তা কঠিন রূপ নেয় এবং মানুষ আত্মভোলা হয়ে বিবাগী মনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজের ও সমাজের ক্ষতি সাধন করতে থাকে। তখন তারা ভালোকে মন্দ বলতে দ্বিধা করে না। সমাজে ভালোকে ভালো বলার লোক হারিয়ে যায়। সেখান থেকে দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করতে শুরু করে।

দুর্নীতিবাজদের নৈতিক বিপর্যয় থেকে অশান্তি ও সার্বিক ধস শুরু হয়। এদের পারিবারিক বন্ধন নেই বললেই চলে। যার ফলে আমাদের দেশে পরিবারের মতো নাগরিক গুণ অর্জনের প্রাথমিক শিক্ষালয় ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এবং পরিবারগুলো তাদের শিশুদের নৈতিক গুণ অর্জনে সহায়তা করার মতো মূল্যবান কাজ করা থেকে দূরে সরে থাকছে। দুর্নীতি নামক বিষের প্রভাবে নিত্য বিলাসী জীবন-যাপনে ব্যস্ত অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব ও বিভেদের দেয়াল সৃষ্টি করছে। এদেক আজকাল স্কুলগুলোতে পড়াশুনা হয় না বলে সবাই ঢালাও অভিযোগ করেন। তাই কোচিংয়ে যেতে হয়।  নোট কিনতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ দিতে হয়। বর্তমান সমাজে অর্থ আছে যার, কোচিংয়ে যাবার যোগ্যতা আছে তার সন্তানের। ফলে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা ভালো জিপিএ ছিনিয়ে নিতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা সাধারণত এই সুযোগের নাগাল পায় না অথবা বঞ্চিত হয়। দেশে শিক্ষিত বেকার সমস্যা কিছুটা লাঘবের জন্য যদি কেউ কোচিং ব্যবস্থা একান্তভাবে জিইয়ে রাখতেই চান তাহলে সেখানে গরীবদের সন্তানদেরকে স্বল্প বা বিনা খরচে পড়ার সুযোগ দেবার কথা ভাবতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা হলেও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনেও বৈষম্য পাখা মেলেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গরীবদের পড়ার ও পড়ানোর জায়গা আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধনীদের পড়ার ও পড়ানোর জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যাচ্ছে। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধনীর দুলালদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো কঠিন প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভর্তি হতে হয় না্। সেখানে তাদের অনেকের জন্য ডোনেশন কোটা বিদ্যমান। সেখানে শিক্ষকদের পারিশ্রমিক অনেক বেশি। তাইতো শত সমালোচনা সত্ত্বেও বেশি আয় করতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির মেধাবী-গরীব শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পার্ট-টাইমার হিসেবে পড়াতে আগ্রহী হয়ে থাকেন!

বলতে দ্বিধা নেই, দেশের সেবাখাতে যে কোনো সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে কেউ দুর্নীতিবাজদের খপ্পরে পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভুক্তভোগী লেখক নিজে বহুবার বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে এমনকি হজের কাগজ সংগ্রহ করতে সরকারি অফিসে গিয়ে দুর্নীতিবাজদের খপ্পরে পড়েছিলেন। ঘুষকে এরা উপরি বলে, কেউ বলে স্পিড মানি। যেটা আমাদের প্রচলিত আইন ও নৈতিকতা অনুযায়ী বলা অন্যায়। এদের লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, আত্মধিক্কার কোনোটিই নেই। এদের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের দেশের গায়ে ‘চ্যাম্পিয়ন দুর্নীতিবাজ’ তকমা লেগেছে যা বর্তমানে কিছুটা কমলেও সেই বিষাক্ত ক্ষত আজও বিদ্যমান ও সবাইকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বিদেশে বসবাসকারী ভুক্তভোগীরাই একথা বেশি অনুভব করে থাকেন। এদের কারণে আমরা এই সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা স্নিগ্ধ-সুন্দ্র দেশে জন্ম নেয়ার পরেও বিদেশে বেড়াতে গেলে বা মরুর দেশে শ্রম বিকাতে গেলে আজও মিসকিন বলে, সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে ক্লাইভ অথবা কলম্বাসের দেশে অভিজাত হয়ে সফরে গেলেও ‘পুওর’ অথবা দুর্নীতিবাজ হিসেবে সন্দেহ করে। আন্তর্জাতিক সমাজে আমাদের নাগরিক ও সামাজিক মর্যাদা এভাবে ধূলায় মিশে গেছে। এটা পুনরুদ্ধার করা খুব জরুরি।

আমাদের দেশে দুর্নীতি হলো অতি পুরনো সামাজিক সমস্যা। কিছু প্রশাসনিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও সামাজিক নীতি ও চলমান কৃষ্টিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সহ্যের শূন্য সীমা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করার কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি। আমাদের সমাজ এখনও দুর্নীতিবাজদের সামনাসামনি ঘৃণা করে না, থুথু দেয়ার সাহস পায় না। কারণ, দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বুক ফুলিয়ে চলার দৌরাত্ম্য দেখায়। তাইতো সময় এসেছে শিশু, কিশোর, যুব, বয়স্ক সবার জন্য ক্ষেত্রবিশেষ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতার শিক্ষা জোরদার করে জাতির মান-সম্মান বাড়ানো। কারণ, মানুষ আইনকে সামনে থেকে ভয় পায়। এটা একদিক থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করে। কিন্তু নৈতিকতা আইনের মানুষসহ সকল মানুষকে দশদিক থেকেই পাহারা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে নৈতিকভাবে সত্ মানুষকে দুর্নীতির ভয়ংকর থাবা স্পর্শ করতে পারে না।

তাইতো ভবিষত্ প্রজন্মকে দুর্নীতির করাল থাবা থেকে বাঁচাতে চাইলে আগে বড়দেরকে অনৈতিক কাজ করা বন্ধ করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করে অসত্য কথাবার্তা প্রচারে সতর্ক হতে হবে। এছাড়া দেশে সকল একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে ব্যবহারিক আঙ্গিকে নৈতিক শিক্ষার প্রচলন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিপর্যায়ে দুর্নীতি দূরীকরণে সহ্যের শূন্য সীমা (জিরো টলারেন্স) সৃষ্টি হবে। এভাবেই জাপানের শিক্ষার্থীদের মতই শিক্ষা পেয়ে ভবিষ্যতে আমাদের সবার মনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিকতার অগ্নিদেয়াল (ফায়ারওয়াল) সৃষ্টি হয়ে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

n লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর