প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে অবদান রেখেছে শিক্ষা ও গবেষণায়ও। তবে গত তিন দশকে এই অবদানের হার অনেকটাই কমেছে। শিক্ষা ও গবেষণায় দেশসেরা হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট-সংকট, গবেষণায় শিক্ষকদের আগ্রহ কম থাকা, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পর্ক, ব্যক্তিস্বার্থ, অনিয়ম এবং ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে দলীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা এলেই দাপট দেখা যায় রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকার। কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগের পাল্লা দিনদিন ভারী হচ্ছে।
.jpg)
এমন পরিস্থিতির মধ্যে শত বছর পূর্ণ করে বৃহস্পতিবার ( ১ জুলাই) ১০১ বছরে পা দিল একসময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মহামারির কারণে শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে সশরীরে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়নি। তবে বিকেল ৪টায় ভার্চুয়ালি একটি আলোচনাসভার আয়োজন করেছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ।
১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত করতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয় পূর্ববঙ্গের তত্কালীন রাজধানী ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করলেও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে জাতি বিনির্মাণে ভূমিকা রাখে পূর্ববঙ্গের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয়টি। শুধু জাতি গঠনই নয়, গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রামেও নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের মতে, ব্রিটিশ এবং পরে পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলের মানুষ যে পিছিয়ে ছিল, সেই অসামঞ্জস্য দূর করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ দিকে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর এদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে। তখন এই অঞ্চল পশ্চাত্পদ ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, যেটা পরে ঢাকায় পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। তারপর ২৫ বছরের আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিণত হলো। এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভূমিকা রেখেছে সেটা হলো, একদল উচ্চশিক্ষিত মানুষ তৈরি করেছে, যারা ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ভূমিকা রেখেছেন।

আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাবি
প্রতিষ্ঠার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়। এ আন্দোলনের দার্শনিক নেতা ছিলেন মনীষী কাজী আবদুল ওদুদ এবং আবুল হুসেন। তাদের প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরপরই যখন পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক পথ রুদ্ধ করতে ভাষার টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছিল তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা এ অপচেষ্টার বিরোধিতা করেন। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু হবে জানালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখনই প্রতিবাদ জানিয়ে ‘না’ ‘না’ শব্দে জবাব দিতে থাকেন। পরবর্তীকালে ভাষার পক্ষে জনমত গঠন, ভাষা আন্দোলনের সূচনা, ভাষার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা।

অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রথম থেকেই সোচ্চার। ছয় দফা প্রশ্নে জনমত গঠন, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এসব কারণেই ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। সে রাতে শহিদ হন ১৯ জন শিক্ষক, ১০১ ছাত্র ও ২৯ কর্মকর্তা কর্মচারী।

নারী শিক্ষায় অবদান
শতবর্ষ আগে বিশ্ববিদ্যালয় যখন গঠন হয় তখন ৮৪৬ ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রী ছিলেন মাত্র এক জন। তার নাম লীলা নাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন তিনি। শুরুর দিককার এসব ছাত্রীরা সমাজে একেকজন নারী শিক্ষার রোল মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের দেখে আরো মানুষ উত্সাহিত হয়েছেন, তারা নিজেরাও সমাজে নারী শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন।
ইত্তেফাক/এসআই
