দায়িত্বে অবহেলা আর কত?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২১, ২১:১৩

চিকিত্সাসেবার প্রধান শর্তই হইল চিকিত্সকের উপস্থিতি। অথচ দেশের বেশির ভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিত্সকের সংকটে ভুগিতেছে। যেইখানে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজন ৯ হইতে ২১ জন চিকিত্সক, সেইখানে এক বা দুই জন চিকিত্সক দিয়া চিকিত্সাসেবা কোনোভাবে চালু রাখা হইতেছে। দুঃখের ব্যাপার হইল, মাঝেমধ্যে সেই সবেধন নীলমণি চিকিত্সকও অনুপস্থিত থাকেন। দেশের সিংহভাগ মানুষ মফস্সলে বসবাস করেন, অথচ এই মহামারিকালেও তাহারা ন্যূনতম চিকিত্সাসেবা পাইতেছেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করিবার জন্য ছয়টি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। ইহা হইল—প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, চিকিত্সকসহ পর্যাপ্ত জনবল, চিকিত্সা-সরঞ্জাম, তথ্য-উপাত্ত, সেবাদানের সঠিক নির্দেশিকা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। ইহার যে কোনো একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি ঠিকভাবে কাজ করিতে পারে না। বাংলাদেশের মফস্সল পর্যায়ে এই ছয়টি অনুষঙ্গের মধ্যে একাধিক বিষয়ের ঘাটতি থাকে প্রায় সকল সময়ই। কোনো একটি উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে পরিমাণ ঔষধ ও যন্ত্রপাতি দরকার, তাহা না থাকিলে কিংবা সিভিল সার্জন অফিস হইতে তাহা ঠিকমতো বণ্টিত না হইলে যথাযথ চিকিত্সাসেবা অধরাই থাকিয়া যাইবে। অর্থ, চিকিত্সা সরঞ্জাম ও জনবলের সকল কিছু থাকিলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে নামকাওয়াস্তে স্বাস্থ্যকাঠামো তৈরি হইতে পারে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হইবে না। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই, যেই কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়িয়া তোলা হইয়াছে। নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নূতন নূতন চিকিত্সকও।

চিকিত্সকরা তৃণমূল স্তরে না থাকায় তাহাদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারিও একাধিকবার উচ্চারণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। কিন্তু বিদ্যমান বিবর্ণ চিত্র উজ্জ্বল হইতেছে না কিছুতেই। গতকালও আমরা একটি নির্দিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হইতে অভিযোগ পাইয়াছি যে, সেইখানে স্বাস্থ্য অফিসার তথা চিকিত্সক উপস্থিত থাকেন না। ইতিপূর্বে আমরা পত্রপত্রিকায় দেখিয়াছি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হইতে গ্রামের হাসপাতালে বদলি ও পদায়ন করা হইলেও সরকারি দলের চিকিত্সক নেতাদের প্রভাব খাটাইয়া গ্রাম হইতে চলিয়া আসেন ঢাকায় বা অন্য বিভাগীয় শহরে। অনেক সময় গ্রামের হাসপাতালে না গিয়াই শহরে বসিয়া বেতন নেন মর্মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হইয়াছে নানান সময়। আর গ্রামের মানুষেরা তো আইসিইউ ও সিসিইউ চিকিত্সাসেবার কথা চিন্তাই করিতে পারেন না। এই জন্য সংকটাপন্ন রোগীরাও সেইখানে অহরহ মারা যান। আমরা ইতিপূর্বে বলিয়াছি, যথাযথ নজরদারির অভাবে দেশের অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা-সরঞ্জাম কোনো কাজেই লাগিতেছে না। বহু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে মেশিন, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি মেশিনগুলি নষ্ট হইয়াছে অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া। আর চিকিত্সকের সংকট এবং অনুপস্থিতির কথা তো পূর্বেই বলিয়াছি। চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি সমাধানের ব্যাপারে আমরা অনেক  বড় কথা ইতিপূর্বে শুনিয়াছি। এমনকি এই ব্যাপারে দায়িত্বে অবহেলা করিলে তাহার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার কথাও শুনা গিয়াছে। কিন্তু এখন অবধি কয় জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে, তাহা আমরা জানিতে চাই। চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিবার প্রথম দায় চিকিত্সকের, যিনি রোগীর চিকিত্সা দেওয়ার পেশাগত ওয়াদা করিয়াছেন কিন্তু তাহা রক্ষা করিতেছেন না। দ্বিতীয় দায় জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। অথচ এই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কোনো অভাব নাই। প্রশ্ন হইল সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার ছাপ কেন থাকিবে না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে?

অপরদিকে করোনার এই মহামারিকালে উপজেলা পর্যায়ে যদি করোনা পরীক্ষা ব্যবস্থা না থাকে, তাহা হইলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাব্য করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করিয়া তাহা নিকটবর্তী কোনো নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতাল হইতে পরীক্ষা করাইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। সময়টা এখন ভালো যাইতেছে না, পরিস্থিতিও স্পর্শকাতর। সুতরাং এখন সংশ্লিষ্ট যে-কাহারো দায়িত্বে অবহেলার অভিঘাত অনেক ভয়ংকর হইবে।