২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বের প্রথম বায়োনিক মানুষ রেক্স আবিষ্কৃত হয়। কৃত্রিম অঙ্গ, রক্ত ও রোটিক হাত-পা আছে এর। রেক্স হাঁটতে পারে, শুনতে পায় এবং বুদ্ধিমত্তাসহকারে কথোপকথন চালাতে পারে। সম্ভবত এসব ধারণা থেকেই আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি চলে এসেছে
বিজ্ঞানের এক চরম উন্নতির যুগে আমরা বাস করছি। আমাদের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও শান্তিময় করার জন্য আবিষ্কার করছি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, ডিভাইস। যেগুলো পূর্বে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলোর আরো উত্কর্ষ সাধনের জন্য চলছে অবিরাম গবেষণা ও প্রচেষ্টা। এসব করে আমরা কোনো কোনো সময় নিজেদের তৈরি যন্ত্রপাতির কাছে আমাদের প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তাকে হার মানাচ্ছি। ইদানীং কয়েকটি বহুল আলোচিত বিষয়ের মধ্যে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের কথা শুনতে পাচ্ছি চারদিকে। বিষয়টি যদিও কম্পিউটারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তার পরও মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে—‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ কি মানুষের চিন্তাধারা ও কাজকে প্রতিস্থাপন করবে? কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে খুবই চিন্তিত, কারণ তাহলে কি অফিসে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, ব্যাংকে, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে সর্বত্রই মানুষের স্থান ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ দিয়ে তৈরি যন্ত্রপাতি দখল করবে? মানুষ বেকার হয়ে পড়বে? যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি চায় কম লোকবল খাটিয়ে বেশি লাভ, বেশি পুঁজির কিছু করতে। ২০, ৫০ কিংবা ১০০ কিংবা হাজার হাজার মানুষের কাজ একটি মেশিন যেহেতু করতে পারে; কাজেই হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাওয়ার কথা। বিষয়টি কি তাই হতে যাচ্ছে?
আবার কেউ কেউ বলছেন, ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তার তেমন কিছু নেই। মানুষ তার প্রয়োজন, উপকার এবং সুবিধার জন্যই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ব্যবহার করবে। সেটি কোনোক্রমেই মানুষের বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে না। মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকবেই। কম্পিউটার মানুষের সৃষ্টি, মানুষের বুদ্ধি খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু তা মানুষের চেয়ে দ্রুতগতিতে এবং নির্ভুলভাবে কোনো হিসাব বের করে দেয়। একইভাবে ‘অর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে, মানুষের বিরুদ্ধে যাবে না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ডিনামাইট মানববুদ্ধি খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে, সেটি মানুষ ব্যবহার করছে নিয়ন্ত্রণে রেখে, কিন্তু সামান্য কারণে মানুষ বিগড়ে গেলে বা মানুষ ভুল করলে যন্ত্র বিগড়ে যায় কিংবা মানুষ রাগান্বিত হলে সেটি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য, নিশ্চিহ্ন করার জন্য, যেখানে কোনো ধরনের মানবতা পরিলক্ষিত হয় না। আর তা নিয়ন্ত্রণে থাকে যতক্ষণ ট্রিগারে চাপ দেওয়া না হয়। কিন্তু চাপ দেওয়ার পর শত চেষ্টা করেও মানুষ তা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের’ ক্ষেত্রেও সেরকম হবে, নাকি আরো ভয়ংকর কিছু হবে—বিষয়টি মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ মানবসভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনবে না তো? এই বিশ্বে মানুষই সৃষ্টি করেছে সমাজ, সভ্যতা, বিজ্ঞান এবং সাধন করেছে চরম উত্কর্ষ। আজ মানুষের বুদ্ধি যদি সেই মানুষকেই অপ্রয়োজনীয় করে ফেলে, তাহলে সেই ইন্টেলিজেন্স বা বুদ্ধিমত্তা সবকিছুতে ব্যবহার করা কতটা যুক্তিযুক্ত বা যুক্তিসংগত, সেটি গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
ভবেশ রায়ের সায়েন্স ফিকশন ‘মহাকাশ ও একটি মানবশিশু’র অন্তর্গত ‘কারাগার গৃহ’ নামক সায়েন্স ফিকশনে আমরা দেখতে পাই, নবনীতা সেনগুপ্তা ছয় কুঠরির একটি ফ্ল্যাটে বাস করেন, যা মাটির নিচে। ঘরটি চারদিক দিয়ে আটকানো, কোনো দরজা-জানালা নেই। সব কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয় তার ফ্ল্যাটে সেট করা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির দ্বারা। তার ছেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পড়াশোনা করে, অথচ সেই ছেলেই তার মায়ের এমন চরম যান্ত্রিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে—‘আমি তোমাকে যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেখতে চাই না। সরাসরি দেখতে চাই।’
‘কী বাজে বকছ তুমি?’ ছেলের কথায় নবনীতা সেনগুপ্তা যেন প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেন, দুঃখও পেলেন। বিরক্ত হলেন এমন ছেলেমানুষি দেখে। বলতে লাগলেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারো না। এ সবই বিজ্ঞানের অবদান। আমরা তার সুফল ভোগ করছি। যান্ত্রিক সভ্যতার সুফল।’
-কিন্তু, মেশিনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারব না কেন?
কথাগুলো বলতে বলতে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে টিটো নিজেও প্রচণ্ডভাবে প্রতিবাদ করে উঠল—‘যখন তোমার মন খারাপ হয়, মনে কষ্ট হয়, তখন কি তুমি ঈশ্বরকে ছেড়ে মেশিনগুলোকে পূজা করো? ওদের কাছেই আশীর্বাদ প্রার্থনা করো? ভুলে যেও না, এই মেশিনগুলোকে তৈরি করেছে মানুষ। ঈশ্বর নন। মানুষ শক্তিশালী, বুদ্ধিমান এবং মহানও বটে। কিন্তু তবু তারা মানুষই, ঈশ্বর নন। যন্ত্র হয়তো অনেক কিছু করতে পারে, কিন্তু সবকিছু পারে না। এই যে আমার ভিডিও স্ক্রিনে আমি এই মুহূর্তে তোমার মুখের ছবি দেখছি, এটা কি সত্যি তুমি? এটা তো তুমি নও। তোমার ছবি বা প্রতিকৃতিমাত্র। আমি ফোনে তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি সত্যিকার অর্থে তোমার গলা শুনছি না। যান্ত্রিক গতির মধ্য দিয়ে তোমার কৃত্রিম কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি।’
আমরা যখন দেখি যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করতে শুরু করেছে, তখন আমরা খুশি না হয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। তখনই মনে হয়, আমরা কি প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছি তাদের দ্বারা? ‘গো’ নামক কয়েক হাজার বছরের পুরোনো গেমের উদ্ভব হয় চীনে। খেলাটি অনেকটা আমাদের দেশের ষোলোঘুঁটি খেলার মতো। উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের ঘুঁটি আটকে রেখে বোর্ডের দখল নেওয়া। যে বোর্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকা দখল করতে পারবে, সে-ই বিজয়ী। ‘গো’ খেলার জন্য গুগল ডিপমাইন্ড ‘আলফা-গো’ কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে। এটি অ্যালগারিদম মেশিন লার্নিং ও ট্রি সার্চিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে করা হয়েছে। এতে পলিসি ও ভ্যালু নেটওয়ার্ক হিসেবে দুটি নিউরাল নেটওয়ার্ক আছে। পলিসি নেটওয়ার্কটি সম্ভাব্য সেবার চাল দ্রুত হিসাব করতে পারে এবং ভ্যালু নেটওয়ার্ক প্রতিটি চালের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় চালগুলে বাদ দিয়ে সম্ভাব্য চালের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে মানুষের এই অপ্রয়োজনীয় চাল বাদ দেওয়ার সক্ষমতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে অবশেষে ভাগ বসাল আলফাগো। আলফাগোর প্রাথমিক পর্যায়ে এক ভিন্ন এক্সপার্ট গেমেও ঐতিহাসিক গেমের চালগুলো মনে রাখতে বলা হয়েছিল। ৩০ মিলিয়ন চালের একটি ডাটাবেস থেকে পরে একটি নির্ধারিত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের পর রি-ইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের সাহায্যে আলফা-গোর সক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করা হয় যে এটি নিজে নিজে খেলার দক্ষতা অর্জন করে। আলফাগো বনাম লি সেডলের গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে। মজার বিষয় ছিল, আলফাগোর ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বেশ বড়সড় একটি ভুল করে বসেন লি সেডল, যিনি ১৮টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী পেশাদার গো খেলোয়াড়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুগল ডিপমাইন্ড চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হয়েছিল আলফাগো। ম্যাচ শেষে দক্ষিণ কোরিয়া গো অ্যাসোসিয়েশন আলফাগোকে ‘গো গ্র্যান্ডমাস্টার’ পদবি প্রদান করে।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন সহজতর করতেই রোবট, মেশিন বা ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যেমনটা সিনেমায় দেখা যায়, মানুষের কাজের সুযোগ কমিয়ে দিয়ে বেকারত্ব ডেকে আনতে পারে এর ব্যবহার। ফলে কাজ হারানো মানুষের বিষণ্নতা, অবসাদে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য সৃষ্টি হবে। এর শুরুটা দেখতে হলে যেতে হবে ১৯৫৬ সালে। ডর্টমুথ কলেজের একদল গবেষক দেখতে চেয়েছিলেন, যন্ত্রপাতি মানুষের মাতোই কাজ করতে ও সাড়া দিতে পারে কি না। তারা ধরে নিয়েছিলেন, যন্ত্রকে সঠিক নির্দেশ দিতে পারলে তারা মানুষের মতোই যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কাজ করতে পারবে। আর এ থেকেই এসেছে আজকের অ্যাপলের সিরি, কিনিট, আইবিএমের ওয়াসন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বের প্রথম বায়োনিক মানুষ রেক্স আবিষ্কৃত হয়। কৃত্রিম অঙ্গ, রক্ত ও রোটিক হাত-পা আছে এর। রেক্স হাঁটতে পারে, শুনতে পায় এবং বুদ্ধিমত্তাসহকারে কথোপকথন চালাতে পারে। সম্ভবত এসব ধারণা থেকেই আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি চলে এসেছে।
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এ বিষয়ে কিছুট সংকেত দিয়েছেন যে, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স মানুষের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে ভবিষ্যতে, যখন এটিকে বেশি উন্নত করা হবে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন তৈরি করা হবে, তা মানব জাতির বিলোপ ডেকে আনতে পারে। এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারবে বা দ্রুতগতিতে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে। তার সঙ্গে মানুষ পাল্লা দিতে পারবে না, কারণ মানুষের বিবর্তন হয় ধীরগতিতে। তবে এটিও সত্য যে, মানুষের রয়েছে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স, যা যন্ত্রের নেই। মানবসৃষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যন্ত্র ব্যবহূত হলে সেই যন্ত্র কি এগুলো অর্জন করতে সমর্থ হবে?
n লেখক: প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ ( ইট্যাব)
