গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে ২১ জেলায় ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বাধিক ৩৯ জন মারা গেছেন। এসব জেলায় সংক্রমণও আগের চেয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য রীতিমতো হাহাকার পড়ে গেছে। বিশেষ করে খুলনা ও কুষ্টিয়ার হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র অক্সিজেন সংকট। শ্বাসকষ্টে ছটফট করছেন রোগীরা। অক্সিজেন সিলিন্ডার কে আগে নেবে—তা নিয়ে রোগীর স্বজনদের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি অবস্থা চলছে। সময়মতো অক্সিজেন না পেয়ে রোগী মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। আর যারা বাড়িতে চিকিত্সা নিচ্ছেন তাদের স্বজনদের ভিড় বাড়ছে অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে।
খুলনা অফিস জানায়, চিকিত্সকরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। করোনার নতুন ‘হটস্পট’ খুলনা বিভাগ। এই বিভাগে একের পর এক মৃত্যু ও শনাক্তের রেকর্ড ভাঙছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে রেকর্ড ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে খুলনায় আট জন, কুষ্টিয়ায় সাত জন, যশোরে সাত জন, ঝিনাইদহে চার জন, সাতক্ষীরায় চার জন, মেহেরপুরে তিন জন, নড়াইলে তিন জন, চুয়াডাঙ্গায় দুজন ও বাগেরহাটে এক জন মারা গেছেন। এই সময়ে নতুন করে এক হাজার ২৪৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। খুলনার সবচেয়ে বড় ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে ১৩০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকছেন ১৮০ থেকে ১৯০ জন। সেখানে মাত্র ৭৭টি শয্যায় রয়েছে কেন্দ্রীয় অক্সিজেনের ব্যবস্থা। বাকি রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে সিলিন্ডার অক্সিজেনের জন্য। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৫০০ সিলিন্ডারের কথা বললেও প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন। জীবন বাঁচানো অক্সিজেন সিলিন্ডার হাসপাতালে আসলেই রোগীর স্বজনরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। দেখা গেছে, চিকিত্সারত রিনা খাতুন শ্বাসকষ্ট নিয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অক্সিজেন সিলিন্ডার পাননি। তার স্বজনরা উত্কণ্ঠায়, কখন অক্সিজেন পাওয়া যাবে। চিকিত্সারত অপর রোগী মমতাজ বেগমের ব্যবহূত সিলিন্ডারের অক্সিজেন শেষ হয়ে গেছে। খালি সিলিন্ডার নিয়ে হাসপাতাল গেটে ছেলে অপেক্ষা করছে নতুন সিলিন্ডারের জন্য।
খুলনার অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা কোম্পানির ডিপো ম্যানেজার সজীব রায়হান বলেন, খুলনায় বর্তমানে করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৭০০টি। সেখানে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৪১০টি। খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংকট আরো বাড়বে।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলার ঘরে ঘরে এখন করোনার সংক্রমণ। কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগীর চাপে হাসপাতালটির চিকিত্সক-নার্সদের হিমশিম অবস্থা। অক্সিজেন সংকট নিরসনে কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফ ২০০টি সিলিন্ডার হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। এর পরও রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সিলিন্ডার সংকট দেখা দিয়েছে। রোগীদের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে দেখা গেছে। জানা গেছে, এ হাসপাতালে মাত্র ১০টি বেডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাসহ ৫৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে জোড়াতালির করোনা চিকিত্সা চলছে। এছাড়া হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের অধিকাংশই মারা যাচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার এম এ মোমেন জানান, রোগী দিন দিন বাড়ছে। হাসপাতালে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আরএমও ডাক্তার তাপস কুমার সরকার জানান, হাসপাতালের সবগুলো বেড সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের আওতায় আনার কাজ চলছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের পিসিআর ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ৮৩০টি নমুনার মধ্যে ৩২৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তের হার ৩৯ শতাংশ।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরো ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মৃতদের মধ্যে ১৪ জন রাজশাহীর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১, নাটোরের ১, নওগাঁর ৫ ও ঝিনাইদহের ১ জন রয়েছেন। হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৬৬ জন। ৪০৫ বেডের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৬২ জন। এদিকে বুধবার রাজশাহীর দুই ল্যাবে তিন জেলার ৫৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ হয়েছে ২৪৮ জনের। এর মধ্যে রাজশাহীতে শনাক্তের হার ৩৯.০৯ শতাংশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭.৯৩ শতাংশ ও নওগাঁয় ৬৩.৫৬ শতাংশ।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সাত জন এবং উপসর্গ নিয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ২৫৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তের হার শতকরা ৪০.৯২ ভাগ। করোনায় এ পর্যন্ত জেলায় ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৬৪ জন। জেলায় করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর জানান, রংপুর বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন করে ৮ জেলায় ৪৬৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে দিনাজপুরে চার জন, ঠাকুরগাঁও জেলায় দুই জন, লালমনিরহাট জেলায় তিন জন এবং গাইবান্ধা জেলায় এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে মোট ২৬ হাজার ৪৪৫ জন আক্রান্ত ও ৫২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল অফিস জানায়, বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি বেড়েছে। বেড়েছে শনাক্তের হারও। গত ২৪ ঘণ্টায় এক জন পজিটিভসহ ছয় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস জানান, নতুন মৃতদের মধ্যে পিরোজপুরের চার জন, বরিশাল ও পটুয়াখালীর এক জন করে রয়েছেন। এছাড়া বিভাগে করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৩১১ জনের। এই সময়ে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৪২ জন রোগী। বুধবার রাতে কলেজের আরটি পিসিআর ল্যাবের রিপোর্টে ১৮৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭৯ জনের। শনাক্তের হার ৪১ দশমিক ৭৯ ভাগ। এদিকে বরিশাল বিভাগে গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৮৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৮৬ জন।
পিরোজপুর অফিস জানায়, জেলা সদরসহ পাঁচ উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৮০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছে কমপক্ষে পাঁচ জন। এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে তিন জন, শহরের ম্যাটার্নিটি রোডে এক জন ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা হাসপাতালে এক জন মারা গেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পিরোজপুর সদর উপজেলায় ২৭ জন, নেছারাবাদে ১৩ জন, ভাণ্ডারিয়ায় ২০ জন, মঠবাড়িয়ায় ১০ জন ও নাজিরপুর উপজেলায় ১০ জন রয়েছে বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সিভিল সার্জন ডা. মো. হাসনাত ইউসুফ জাকী জানান, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮২টি স্যাম্পল পরীক্ষা করে ৮০ জন পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। জেলা হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য র্যাপিড টেস্ট মেশিন বসানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গতকাল সকাল থেকে জেলা জুড়ে কঠোর লকডাউন চলছে। বিনা প্রয়োজনে কেউ রাস্তায় থাকলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পিরোজপুর শহরে গতকাল সকালে ম্যাটার্নিটি রোডে এক প্রাথমিক শিক্ষক ও মঙ্গলবার রাতে মাছিমপুর এলাকায় এক জন গৃহবধূর করোনায় মৃত্যু যথাসময় স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে না আসায় তাদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
