সাক্ষ্য আইনের একটি ধারার কারণেই সমালোচনার শিকার অভিযোগকারী

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ০০:০৫

অহরহ চলছে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা। কিন্তু এসব ঘটনায় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক সময় বিচারে পার পেয়ে যায় আসামি। অনেক ক্ষেত্রে বিচার চাইতে গেলে উলটো ভুক্তভোগীকেই আরো অপদস্থ হতে হয়। যেখানে অপরাধীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথা, সেখানে ভুক্তভোগী নারীর চরিত্র নিয়েই চলে কাটাছেঁড়া। এমন ঘটনা এখন হরহামেশা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও এর বাইরে থাকছে না। যা কেবল পরীমনির ক্ষেত্রেই নয়, নারীদের হয়রানির প্রায় প্রতিটি ঘটনায় একই চিত্র দেখা যায়। গবেষকরা বলছেন, সাক্ষ্য আইনের একটি ধারাই আদালতে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে। ঐ ধারার সুযোগ নিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে দুশ্চরিত্র প্রমাণের চেষ্টা করে আসামি পক্ষ। এটা প্রমাণ করতে পারলেই আসামিরা সুবিধা পান। 

সম্প্রতি ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। ফেসবুকে পরীমনির সেই পোস্টে হাজার হাজার হা হা প্রতিক্রিয়া পড়ে। কমেন্টসে অশালীন মন্তব্য আর গালাগালির সংখ্যাও ছিল হাজার হাজার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফাতেমা সুলতানা শুক্লা বলছেন, ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীর দিকেই আঙুল তোলার সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল সমাজে। আর এখন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যম একটি সামাজিক আদালতের মতো কাজ করে। আর সামাজিক আদালত বিচারিক আদালতের আগেই ভিকটিমের চরিত্রহনন ঘটায়। তার মতে এই অপচর্চাকে উত্সাহিত করছে দেড়শ বছরের পুরোনো সাক্ষ্য আইন।

গবেষণায় দেখা যায়, ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী সাক্ষীকে বা অভিযোগকারীকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করতে পারলে শতকরা ৭৫ ভাগ মামলায় আসামিদের কোনো শাস্তি হয় না। ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সালে সাক্ষ্য আইন ব্যবহার করা ৩০০ মামলা নিয়ে গবেষণায় নৃবিজ্ঞানী শুক্লা বলেছেন, আসামি নয়, বরং ভুক্তভোগীর চরিত্র বিশ্লেষণ মূল বিষয়। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ২৯৯টি মামলার রায়ে।

শুক্লা বলেন, আমাদের সবার একসঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে সেই মামলার জায়গাটায় যে, নারীর চরিত্রের সঙ্গে নারীর নিপীড়ন অভিজ্ঞতার কোনো যোগসূত্র নেই। ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ল রির্পোট বিশ্লেষণ করে ধর্ষণের মামলায় সাক্ষ্য আইনের ব্যবহার নিয়ে লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্টের গবেষণা বলছে একই কথা। 

যে অভিযোগ আনল, সে ভালো নারী না খারাপ নারী, তার চেয়ে আমরা যতদিন না ঠিক প্রশ্ন করতে পারব, ততদিন ধর্ষণের মামলায় ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব হবে না বলে জানান ব্লাস্টের গবেষণা বিশেষজ্ঞ তাকবির হুদা।

ঔপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণার যে আইন এখনো বলবত্ আছে তার মধ্যে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা অন্যতম। এই ধারায় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে অভিযোগ এসে সাক্ষীর সাক্ষ্যমান নষ্ট করার জন্য সংযোজন করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা ব্যবহারকারী মামলায় কার কার ধর্ষণ হয় না, সেখানে লেখা আছে—দুশ্চরিত্রা নারীর ধর্ষণ হয় না, বাড়াইট্টা নারীর, নষ্টা নারীর ধর্ষণ হয় না। বেশ্যার কখনো ধর্ষণ হয় না, যৌনতায় অভ্যস্ত নারীর ধর্ষণ হয় না, ডিভোর্সি নারীর ধর্ষণ হয় না, সহজলভ্য নারীর ধর্ষণ হয় না, প্রেম করলে ধর্ষণ হয় না, অসতী নারীর ধর্ষণ হয় না’ বলে উল্লেখ আছে। 

তাকবির হুদা বলেন, ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা বাতিল করতে হবে। প্রয়োজনে ১৫১ ধারা ও ১৫২ ধারায় বিচারকদের নির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে যে, কোনো ধরনের অপমানজনক বা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যাতে ভুক্তভোগীকে আদালতে করা না হয়। সঙ্গে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করে, ভুক্তভোগীদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।

এই সাক্ষ্য আইনটির সংস্কার নিয়ে ব্লাস্ট অনেক দিন ধরে কাজ করছে, কিন্তু আসলে এখনো তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত বছর অক্টোবরে ধর্ষণ নিয়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদ হলো, সেই সময় একটা সুযোগ ছিল, সাক্ষ্য আইনের ধারাটা বাতিল করার। কিন্তু তা হলো না।

আইনজীবী তাকবির হুদা বলেন, যতদিন এই ধারা থাকছে, ততদিন বিচারের নারীর চরিত্র নিয়েই আলোচনা হবে। যদিও সেখানে কেবল আলোচনা হওয়া উচিত, অপরাধী ধর্ষণ করেছে কি না? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে খোঁজা হয়—যে অভিযোগ আনল সে ‘ভালো নারী’ না ‘খারাপ নারী’। তার চরিত্র কেমন, সে কেমন পোশাক পরে, সে কার সঙ্গে মেশে, এটাই।

চলতি বছর গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল হক বলেছেন, ধর্ষণ মামলায় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে ‘নেতিবাচক’ মন্তব্য করার বিধান আইন থেকে বাদ যাচ্ছে। এ ধরনের বিধান বাদ দেওয়াসহ বিদ্যমান সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে সংসদের আগামী অধিবেশনে তোলা হবে বলে তিনি জানান। ‘সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা, এখানে রেপ কেসে (ধর্ষণ মামলা) ভিকটিমের চরিত্র নিয়ে কথা বলার একটা সাব সেকশন আছে। সেটাকেও পরিবর্তন করার জন্য আমি নির্দেশনা পেয়েছি। সেটাও পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা মনে হয়, পূর্ণাঙ্গভাবে সেপ্টেম্বর মাসে যে সংসদ অধিবেশন হবে সেখানে আইন নিয়ে আসতে পারব।