আমরা দেখিয়াছি, সমস্যাসংকুল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সকল দায়দায়িত্ব সরকার পরিচালনকারী এক নম্বর ব্যক্তির ওপর অর্পিত হয়। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সরকারি কার্যক্রম সুসমন্বয়ের উদ্দেশ্যে ৬৪ সচিবকে দেশের ৬৪ জেলার ছায়া দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে। সরকারপ্রধান দেশটি আমলা, নাকি কামলাদের মাধ্যমে পরিচালনা করিবেন তাহা বিষয় নহে, তিনি যে কাউকেই দিয়াই দেশ চালাইতে পারেন। তবে প্রশ্ন হইল, একজন সচিবকে কোনো জেলার ছায়া দায়িত্ব পালন করিতে দেওয়া হইলে ঐ জেলার ডিসি-এডিসিসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা কী করিবেন? বহু ক্ষেত্রেই অতি সন্ন্যাসে গাজন নষ্ট হয়। বরং যিনি যেইখানে আছেন এবং যেই দায়িত্ব রহিয়াছেন, সেই দায়িত্ব যদি তিনি ঠিকমতো পালন করেন, তাহা হইলে সিঁড়ির উপর সিঁড়ি বসাইবার দরকার পড়ে না। করোনা মহামারির সময় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। এখন কোনো উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যদি তাহার কর্মস্থলে না থাকেন, সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জন কি দায়িত্ব এড়াইতে পারেন? সিভিল সার্জনের অন্যতম কাজই হইল ইহাদের তদারক করা! ধরা যাউক, বিদ্যুতের কোনো সমস্যার কথা। বিদ্যুত্ বিভাগের দায়িত্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আছেন। আছেন একজন প্রতিমন্ত্রী। বিদ্যুতের কোনো সমস্যা তাহাদের গোচরে আনিলে সমাধান হইয়া যায়। যদি সমাধানের জন্য হাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাইতে হয়, তাহা হইলে বিদ্যুতের বড় কর্মকর্তারা আছেন কী করিতে?
অনেকেই অভিযোগ করিয়া থাকেন যে, বিভিন্ন পর্যায়ের কোনো কোনো সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা বর্তমানে প্রক্সিতে ব্যবসায়ে যুক্ত রহিয়াছেন। দেশ স্বাধীন হইবার পর একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলিয়াছিলেন, এই সচিবালয় দিয়া স্বাধীন দেশ পরিচালনা করা যাইবে না। কিন্তু কথা তাহা নহে, কথা হইল—দেশ তো চালাইতে হইবে। এই যে মহামারি, এই ঘটনা তো বিশ্বে নূতন নহে। অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও আসিবে। কিন্তু উন্নত বিশ্ব এই অবস্থায় কী করিতেছে? তাহারা তাহাদের জনসংখ্যার বৃহত্ অংশকে টিকার আওতায় আনিতে মহাপরিকল্পনা করিয়াছে অনেক পূর্ব হইতেই। যুক্তরাষ্ট্রে তো এখন ১২ বত্সর বয়সিদের উপরেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা হইতেছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ১২ বত্সর বয়সিদের টিকাকরণের কথা চিন্তা করা দূরের ব্যাপার, চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদেরও ঠিকমতো এবং সময়মতো টিকা দিতে পারিতেছি না। অর্থাত্, যেই দিকে তাকানো যায় সেই দিকেই সমস্যার জঞ্জাল। আমরা পত্রিকায় দেখিয়াছি, একজন রাজনীতিবিদ বলিয়াছেন, তাহাদের যদি ১০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহাতে ট্যাক্স কর্তন করিবার পর উহা ৬০ টাকা হইয়া যায়। ইহা একটি অনুল্লিখিত বিষয়। কিন্তু ইহার পর যখন দেখা যায় যিনি কাজটা পাইয়াছেন তিনি কাজটি এক-চতুর্থাংশ করিয়া বিল তুলিয়া লইয়াছেন, তখন প্রশ্ন জাগে, যাহারা ইহা দেখিবার দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা কী করিলেন? সরকারি পর্যায়ে সহজে চাকুরি যায় না, কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে দেখিতে পাওয়া যায় যে, তাহার কোনো অংশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাজের কাজ কিছুই করিতেছেন না, তখন সেইখানে ঢালাওভাবে চাকুরিচ্যুতির ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক। এই সকল কথা আমরা বারংবার বলিয়া আসিতেছি। কিন্তু কথায় আছে—চোরে শোনে না ধর্মের কাহিনি।
আমরা বড় গলায় বলি, দুর্নীতি দমন করিতে আমাদের একটি কমিশন রহিয়াছে। দুদক গলা ফুলাইয়া বলেন, তাহারা রুই-কাতলা ধরিবেন। কিন্তু বাস্তবতা হইল, তাহাদের জাল দিয়া রুই-কাতলা ধরিবার কোনো সিস্টেমই নাই। জেলেরা বড় মাছ ধরিতে গিয়া চুনোপুঁটি পাইলে তাহা তো আর ছাড়িয়া দেন না। দুদকেরও ঐ চুনোপুঁটি ধরাটাই সান্ত্বনা। সিস্টেম অনুযায়ী এক মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয়, অন্যরা জিনিসপত্র সরবরাহ করে, আরেক মন্ত্রণালয় নির্মাণ করে। ইহা সারা বিশ্বেরই সিস্টেম। বিশ্বের উন্নত দেশগুলি এই সিস্টেম অনুযায়ীই রাষ্ট্রীয় কার্য সম্পাদন করিতেছে। কিন্তু আমাদের এইখানে দেখা যায় সমন্বয়ের বড় অভাব। চোখের সহিত মস্তিষ্কের কিংবা হূিপণ্ডের সহিত ফুসফুসের ঠিকমতো বুঝাপড়া না থাকিলে আমরা তো অন্ধ হইয়া যাইব, নিঃশ্বাস লইতে পারিব না। আমরা ব্যাংকগুলির দিকে তাকাইতে পারি না। সেইখানে কী কাণ্ড ঘটিতেছে, তাহা এখন কাহারো নিকট অজানা নহে। ইহাদের লইয়া তো বসিতে হইব, ভাবিতে হইবে, দেখিতে হইবে। মুশকিল হইল, আমরা যে যাহার অবস্থান হইতে যেইটুকু পাই তাহা লইয়াই সন্তুষ্ট থাকি, অন্য সমস্যার দিকে যেন তাকাইবার সময় নাই! ফলে সরকারপ্রধানকে বহু ক্ষেত্রেই অসহায় দেখায়। অথচ সমস্ত সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু তিনি। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে এত বড় প্রশাসন থাকিয়া লাভ কী? এখন এই মহামারিতে বড় কোনো ক্ষতি হইয়া গেলে দায়ও পড়িবে সরকারপ্রধানেরই ঘাড়ে। তাই অনেকেই বলিয়া থাকেন, সকল দায় যখন সরকারপ্রধানেরই, তখন তাহার উচিত ‘সরকার’ বাদ দিয়া কেবল ‘প্রধান’ রাখিয়া শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করা!
