বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কায় দরকার বড় প্রস্তুতি

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ২২:০১

সাধন সরকার

করোনা মহামারির মধ্যেও ভূমিকম্প মাঝেমধ্যে ভূপৃষ্ঠকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দফায় দফায় মোট আট বারের বেশি কেঁপে ওঠে সিলেট নগরী। এর আগেও সিলেটে ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়েছে বেশ কয়েক বার। মাঝেমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হঠাত্ করেই স্বাভাবিকভাবে ভবন হেলে পড়ার সংবাদ পাওয়া যায়। বোঝাই যায়, সঠিক নিয়মকানুন ও উপাদান দিয়ে এসব ভবন নির্মাণ করা হয়নি। যেনতেনভাবে ভবন নির্মাণ করলে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ঢাকা শহরের আবাসিক ভবনগুলো একটির সঙ্গে আরেকটির গা লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পুরান ঢাকার অবস্থা তো আরো খারাপ। মূলত এ কারণেই ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিটা বেশি।

পৃথিবীতে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছে তার মধ্যে ভূমিকম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দুর্যোগ। ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব নয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মাঝারি বা বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানী ঢাকায় ‘বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ না মেনে ও জলাভূমি ভরাট করে নির্মিত এমন হাজার হাজার ভবন ভূমিকম্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সূত্র বলছে, দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষানিরীক্ষায় ঢাকা মহানগরের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ পাকা ভবনের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ ভবন ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগে যথাযথ ডিজাইন না করে তথা ভূমিকম্পরোধী ডিজাইন না করে ভবন নির্মাণ, নির্মাণকাজের তত্ত্বাবধানে অবহেলা, নিম্নমানের উপকরণের ব্যবহার, অননুমোদিত ফ্লোর বাড়ানো, দুর্বল মাটিকে শক্তিশালী না করে ও জলাভূমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ ইত্যাদি ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ায়। ঢাকায় ঝুঁকির কারণ যতটা না ভূতাত্ত্বিক, তার চেয়ে বেশি অবকাঠামোগত। এক্ষেত্রে দুইটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ১. যে ভবনগুলো তৈরি হয়ে আছে সেগুলো রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে কিংবা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মতো নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলা। ২. বর্তমানে যে ভবনগুলো গড়ে তোলা হবে সেগুলো যথাযথ ‘বিল্ডিং কোড’ ও ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা।

একটা ছোট কিংবা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পর সবাই নড়েচড়ে বসে। সরকার থেকে প্রস্তুতি ও সচেতনতার কথা বলা হয়, মিডিয়ায় দু-এক দিন লেখালেখি হয়, জনসাধারণের মুখে ঘটনার বিবরণ থাকে। তারপর আবারও সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়! ভুলে যায় ভূমিকম্পের প্রস্তুতি কতটা আছে, প্রস্তুতি ও সচেতনতা কেমন হওয়া দরকার ছিল। আমরা এটা ভাবি না যে, আজ যে ছোটখাটো ভূমিকম্প আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে এটা কোনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। যে দুর্যোগটি রোধ করার উপায়ই মানুষের হাতে নেই তার জন্য আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা ছাড়া আর কী বা করার আছে। ভূমিকম্পের সময় ও পরে কী করতে হবে, সে সম্পর্কে জনগণের মধ্যে ধারণা ও সচেতনতা থাকা জরুরি। ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকুনিতে কী করতে হবে, ঘর থেকে বের হতে না পারলে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে ইত্যাদি সচেতনতা নগরবাসীর মধ্যে তৈরি করা দরকার। আর সচেতনতা সৃষ্টির কাজটি স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের ভূমিকম্পের সতর্কতার মহড়া ও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

নারিন্দা, সূত্রাপুর, ঢাকা