রাজধানীর জলাবদ্ধতা, উপায় কী?

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ২২:০৭

 

খালগুলোর বেহাল অবস্থা থেকে মুক্ত করতে হলে সিএস রেকর্ড মোতাবেক কাজ করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর/ পিলার বসাতে হবে। সিএস রেকর্ড ধরে এসব খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ ঘরবাড়ি ও স্থাপনা অপসারণ করতে হবে

সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটুসমান পানিতে ডুবে যাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ সড়ক। আবার মহানগরীর পার্শ্ববর্তী নিচু এলাকাগুলোতে জমে যাচ্ছে কোমরসমান পানি। ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। একসময় ঢাকায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল আঁকাবাঁকা খাল-বিল-ঝিল। বৃষ্টি হলেই খাল-বিল-ঝিল হয়ে পানি নদীতে পড়ত। পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা ধুয়েমুছে পরিষ্কার হতো শহর। জলাবদ্ধতায় যাতায়াতে  মহানগরীতে নৌকার  দেখা মেলে!

ঢাকা ওয়াসার ২০১০-এর এক জরিপে প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে জলাবদ্ধতার নেপথ্যের কারণ। বেদখল হওয়া খাল অবৈধভাবে গত তিন থেকে চার দশক দখল করে নেয় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ রাজনৈতিক ক্ষমতাধর দখলদার, যাদের অনেকই ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্স সেন্টারের ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় ৭৩টি খাল আছে। ২০১৬ সালে করা ঢাকা জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ জরিপ বলছে, খালের সংখ্যা ৫৮টি। জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উল্লিখিত খালের ৩৭টিতেই দখলদার রয়েছে। দখল ও দূষণের কারণে খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে, কোনো কোনোটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। আগে খাল রক্ষণাবেক্ষণে ঢাকা ওয়াসার জন্য নিজস্ব বরাদ্দ ছিল না। সংস্কারের জন্য স্থানীয় সরকার থেকে ৪০/৬০ কোটি টাকা পেত। তাছাড়া প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প গৃহীত হলেও এর অগ্রগতি খুবই  হতাশাব্যঞ্জক। বাস্তবতার নিরিখে সময় উপযোগী পদক্ষেপে দেশের নগরবিদরা দুটি সিটি করপোরেশনের খাল উদ্ধারের দায়িত্ব প্রাপ্তির কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর খাল ও নালার রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের কাছে ২৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। অতীতে ভারী ও মাঝারি বৃষ্টির পর রাজপথ ডুবে চলাচলে অযোগ্য হয়ে পড়া, এ নিয়ে অনেক লেখালেখি ও আলোচনা-সমালোচনা বেশ হয়েছে। এক্ষেত্রে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের পারস্পরিক দোষারোপ ও সমন্বয়হীনতার কথা অনেক শোনা গেছে। অবশেষে যখন রাজধানীর খাল পুনরুদ্ধার ও পয়োব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসার মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়, সমঝোতা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এই সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক।

সংস্কারকাজ শুরু করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। খাল-নালা সংস্কারের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তরের ইব্রাহিমপুর খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, গোদাগাড়ী খাল, রূপনগর খাল, সাগুপ্তা খালসহ ১৪টি খাল থেকে গত কয়েক মাসে ১১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। এখন খালের সীমানা নির্ধারণ, বাসাবাড়ির পয়োনিষ্কাশন লাইন খাল থেকে বিচ্ছিন্ন করার মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জিরানী খাল, মান্ডা খাল, শ্যামপুর খাল, কদমতলা খাল, কমলাপুর খালসহ দুটি বক্স কালভার্ট থেকে গত কয়েক মাসে ৭ লাখ মেট্রিক টন বর্জ্য ও পলিমাটি  অপসারণ করেছে এবং বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু এই বিস্তর কর্মযজ্ঞের সুফল কি নগরবাসীর পাচ্ছে? ০১.০৬.২০২১ তারিখে সকাল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা বৃষ্টিতে ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি নিতে পারেনি ঢাকা সিটি। সিটিতে কোথাও হাঁটু কোথাও কোমরসমান পানি ছিল। জনগণকে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হলো। বনানী, মিরপুর, এয়ারপোর্ট রোডেও পানি জমেছে। উত্তরের মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পানি ছয়টি রিটেনশন পন্ডে (পানি জমা হওয়ার জায়গা) জমা হওয়ার কথা। কিন্তু তা নেই, দখল হয়ে গেছে, যেমন কল্যাণপুর রিটেনশন পন্ডের ১৭১ একর জায়গার মধ্যে দখল হয়ে গেছে ১৭০ একর। কিন্তু প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বের কারণে তা দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন কীভাবে হবে? শুধু খাল ও নালা পরিষ্কার করলে হবে না, সঙ্গে সঙ্গে খালগুলো দখলমুক্ত করে সংযোগ নিশ্চিত করে ঢাকা চার পাশের নদীর (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা) সঙ্গে পানির প্রবাহ যুক্ত করতে হবে। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী পদ্মা সেতুর রেলপথ-মেট্রোরেলের কাজের কারণে কয়েকটি খালের পানিপ্রবাহের সংযোগ বন্ধ হয়ে আছে। এ সমস্যারও উপায় বের করতে হবে। তাহলে খালের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কার্যক্রমের অগ্রগতি হবে। তাছাড়া খালগুলোর বেহাল অবস্থা থেকে মুক্ত করতে হলে সিএস রেকর্ড মোতাবেক কাজ করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর/ পিলার বসাতে হবে। সিএস রেকর্ড ধরে এসব খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ ঘরবাড়ি ও স্থাপনা অপসারণ করতে হবে।  যেসব অবৈধ স্থাপনায় পানি, বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে সেসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নালা ও খাল পাড়ে যাদের বাসাবাড়ি আছে, খালে পয়োনিষ্কাশনের প্রবাহ বন্ধ এবং বর্জ্য ফেলতে না পারে তা নজরদারিতে আনতে হবে। খালে স্বচ্ছ পানিপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। খালে ওয়াটার কার চালু করা যেতে পারে। খালের পাড়ে জনসাধারণের জন্য ওয়ার্কওয়ে  সাইকেল লেন সংযোজন করা যেতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন জাতের বৃক্ষরোপণ করা হলে সবুজ বৃক্ষরাজিতে গ্রিন সিটি করপোরেশন বাস্তবায়ন সহজ হবে। তাছাড়া পরিবেশ ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। তা বাস্তবায়ন করতে সিটি করপোরেশন ও সবার ঐকান্তিক সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। আমরা সবাই জানি, এ মহানগরীতে ১ কোটি লোকের বসবাস। বসবাসযোগ্যের জন্য খাল উদ্ধারে সিটি করপোরেশন আরো সোচ্চার হতে হবে। সবার এখন মনে রাখা দরকার, ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ কোনো সহজসাধ্য ও স্বল্পদিনের দিনের কাজ নয়। এর জন্য দরকার বাস্তব পরিকল্পনা, সঠিক সমন্বয় ও পরিকল্পিত কার্যকর পদক্ষেপ।

n লেখক :ব্যাংকার