সমাজে গরু-ছাগলের অবদান আছে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ২২:০৮

শাহজাদা, প্রিন্স, বস, খান বাহাদুর, বীর বাহাদুর, লাল বাহাদুর, কালাচাঁদ কিংবা সিনবাদ—এসব কোনো ব্যক্তির নাম, বংশপদবি বা পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র ভেবে ভুল করবেন না। গেল বছর রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট দাপিয়ে বেড়িয়েছিল এই ‘নামওয়ালা’ গরু। সাধারণ গরু থেকে ‘অভিজাত’ হয়ে ওঠার কারণ দাম

গরু-ছাগল আমাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্কুলে গরুর রচনা পড়েন নাই, এমন মানুষ খুবই কমই আছেন। আবার ছাগল নিয়েও পাঠ্যবইয়ে কম মাতামাতি হয়নি। পাগলে কী না বলে ছাগলে কী না খায়—এটা আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রবাদ। যদিও ছাগলে যা-ই খাক, ঘুষ খায় না, এটা প্রমাণিত। অবশ্য কে কী খাবে বা পান করবে, এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তার পরও আমরা কেন জানি অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে মাতামাতি-ঘাঁটাঘাঁটি করতে পছন্দ করি। যাহোক, দেশের উন্নয়নে গরু-ছাগলেরও যোগ আছে। আর বর্তমান সরকার কেবল মানুষবান্ধব নয়, প্রাণিবান্ধবও বটে। তাই তো সদাশয় সরকার দেশের গরুর-ছাগলের উন্নয়নেও বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এই খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। আমাদের দেশে মানবসম্পদের উন্নয়নের চেয়ে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন অধিক দৃশ্যমান হচ্ছে। বিভিন্ন মানুষের পাশাপাশি প্রাণীদের নিয়েও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হচ্ছে।

শাহজাদা, প্রিন্স, বস, খান বাহাদুর, বীর বাহাদুর, লাল বাহাদুর, কালাচাঁদ কিংবা সিনবাদ—এসব কোনো ব্যক্তির নাম, বংশপদবি বা পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র ভেবে ভুল করবেন না। গেল বছর রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট দাপিয়ে বেড়িয়েছিল এই ‘নামওয়ালা’ গরু। সাধারণ গরু থেকে ‘অভিজাত’ হয়ে ওঠার কারণ দাম। কোনোটিরই দাম ১০ লাখ টাকার নিচে নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অভিজাত গরু নিয়ে ধারবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরও বিভিন্ন নামিদামি গরুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ইদানীং গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়ালেরও নাম দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের নামডাক বাড়ছে। যদিও শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ‘নামে কী-বা আসে যায়!’ তার পরও সবকিছুর নাম বোধহয় একটা লাগেই! কোরবানির গরুর নামকরণ তো এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। টাঙ্গাইলের এক গরুর নাম রাখা হয়েছে ‘সাকিব খান’, দাম আশা করা হচ্ছে ১৩ লাখ টাকা। মাদারীপুরে বিরাটকায় এক গরুর নাম ‘নবাব’। এর দাম হাঁকা হচ্ছে ৯ লাখ টাকা। পঞ্চগড়ের দুই গরুর নাম হচ্ছে ‘বস’ আর ‘বিগ বস’! বসের কাঙ্ক্ষিত দাম ৭ লাখ টাকা, আর বিগ বসের ১০ লাখ টাকা! 

রেসলিং রিং কাঁপানো ‘ডেড ম্যান’ খ্যাত আন্ডারটেকার এবং রক বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই রেসলারের জনপ্রিয়তা আছে দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে। আসন্ন কোরবানিতে বিক্রির জন্য দুটি গরুর নাম দেওয়া হয়েছে এই দুই রেসলারের নামে। গরুর মালিকের দাবি, দুই রেসলারের মতো বিশাল দেহের অধিকারী তার পালিত গরু দুটি। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিখ্যাত রেসলারের নামে রাখা হয়েছে গরু দুটির নাম।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিশাল দেহের গরু দুটি বড় করছেন হাবিল মিয়া এবং তার স্ত্রী শেফালী বেগম। এবারের কোরবানিতে গরুগুলো বিক্রি করতে চায় পরিবারটি। আন্ডারটেকারের দাম চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ ৪৯৯ টাকা। আর রকের দাম চাওয়া হচ্ছে ২২ লাখ ৪৯৯ টাকা। এই মালিকের নাকি আরো দুটি গরু আছে। নাম মানিক ও রতন। মানিকের দাম চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ ৪৯৯ টাকা। আর রতনের দাম হাঁকা হচ্ছে ৩৫ লাখ ৪৯৯ টাকা।

তবে বিশেষ বিশেষ গরুর দাম আর নাম যা-ই হোক, এ বছর কোরবানিতে ‘গরু-ছাগলের ঘাটতি হবে না’ বলে আশ্বস্ত করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, গরু, ছাগল, ভেড়া ও উট মিলিয়ে মোট ১ কোটি ১৯ লাখের মতো পশু রয়েছে, যা কোরবানি উপলক্ষ্যে হাটে উঠবে। কাজেই দেশে পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য এবারও গবাদি পশুর সংকট হবে না। লকডাউন, করোনা ইত্যাদি উপেক্ষা করে মানুষ কীভাবে গরু-ছাগল সংগ্রহ করবে, সেটা অবশ্য একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থাকছে।

যাহোক, গরু-ছাগল নিয়ে মানুষের ভূমিকা কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর। গরু-ছাগল অত্যন্ত নিরীহ, নম্র ও ভদ্র স্বভাবের প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ এগুলোকে জবাই করে খায়। অথচ উগ্র মেজাজি হিংস্র স্বভাবের বাঘ কিংবা সিংহের মাংস মানুষ সাধারণত খায় না। গরু-ছাগল থেকে আমরা অনেক উপকৃত হই। বিনিময়ে তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো কিছুই পায় না। গরু-ছাগলের ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। তাই হয়তো ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার গরুকে দেবতার আসনে বসিয়ে তাদের প্রতি ঋণ-শোধের একটা চেষ্টা করেছেন!

সমাজে গরু-ছাগলের অনেক অবদান আছে। এদেরকে আমরা পশু বললেও এগুলো মদ-গাঁজা-ভাং-ইয়াবা খায় না। পরিবেশ দূষিত করে না। তবে ছাগলের চেয়ে গরু কিছুটা অভিজাত। গরুর গাড়ি আছে। কিন্তু ছাগলের নেই। ছাগল ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে বেশি। তুলনায় গরু নীরব, শান্ত। গরু দিয়ে হালচাষ করা গেলেও ছাগল দিয়ে হালচাষ করা যায় না। ছাগলের গোবর তেমন কোনো কাজে আসে না। ছাগলের চামড়া দিয়ে ভালো মানের জুতোও তৈরি করা যায় না। ছাগলের নিজস্ব স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ করে পরিবেশ দূষিত করে। আসলে দোষে-গুণে ছাগল। কোনো ছাগলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আবার সব গরুই নিরীহ নয়। অনেক গরু আছে যেগুলো গুঁতোতে পছন্দ করে। লাথিও মারে। সে তুলনায় ছাগল ভালো পশু। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো ছাগলকে সমাজবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যায়নি।

আসলে ছাগল সম্পর্কে আমাদের রয়েছে একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। ছাগলের দোষ ধরতেই আমাদের সমাজ যেন বেশি তত্পর। ছাগলের নামে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক সম্ভবত তাকে সর্বভুক হিসেবে গণ্য করা। অথচ এটা সর্বৈব মিথ্যা। ছাগল তৃণভোজী, সে চিকেন, মাটন, বিফ, পর্ক, মাছ, ডিম প্রভৃতির সামান্য পরিমাণও স্পর্শ করে না, খাওয়া তো দূরের কথা। বিপাকে পড়ে কদাচিত্ সে প্লাস্টিকের প্যাকেট, ঈদসংখ্যা ম্যাগাজিন, হাওয়াই চটির স্ট্র্যাপ, শাড়ির আঁচল, শিশুর ডায়াপার বা বাজারের ফর্দের মতো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য গলাধঃকরণ করে থাকে, সে কথা সত্য। কিন্তু সাধারণভাবে তৃণ ও কাঁঠালপাতার প্রতিই তার মনোযোগ বেশি ন্যস্ত থাকে। এ বিষয়ে সে মানুষের মতো খুঁতখুঁতে নয়। যেসব মানুষ আগ্রহ নিয়ে কাঁঠাল খায়, তারাও হয় খাজা নতুবা রসালো—এই দুয়ের একটিকেই অধিকতর পছন্দ করে। ছাগল কাঁঠালপাতা পাওয়ামাত্র উদরস্থ করে, সেটা খাজা না রসালো, তা পরীক্ষা করবার প্রয়োজন বোধ করে না।

শুধু এই কারণেই ছাগলকে সর্বভুক বলে গালি দেওয়া নিতান্তই অন্যায্য। হিন্দুরা গরুকে প্রয়োজনের অধিক মাথায় তুলে নৃত্য করে, অথচ ছাগলকে গালি দেয়। অথচ ছাগল গরু অপেক্ষা অধিক সংস্কৃত প্রাণী। তৃণ, কাঁঠালপাতা, পালং চারা, প্লাস্টিক, দৈনিক পত্রিকার অংশ, সে যা-ই ভক্ষণ করুক, পশ্চাদ্দেশ থেকে হজমোলার গুলির মতো সমান মাপের ট্যাবলেট নিষ্ক্রমণ করে থাকে। ছাগলের নাদি অনাদিকাল থেকেই প্রযুক্তির এক অসীম বিস্ময়। গরু হাজার জীবনেও এইরূপ গোবর ক্যাপসুল প্রদানে অক্ষম। সে ক্ষমতা যদি তার থাকত তবে গ্রামের বধূরা কষ্ট করে ঘরের প্রাচীরে ঘুঁটে বানাত না।

ছাগলের প্রতি এই বিমাতৃসুলভ আচরণ শুরু হয় প্রাথমিক বাংলা পাঠাভ্যাসের শুরু থেকেই। প্রথম পৃষ্ঠাতেই শিশুদের শিক্ষাদান করা হয়, ‘অ-এ অজগরটি আসছে তেড়ে’ বলে। অথচ আমরা বাস্তব জীবনে কয়জন অজগর দেখবার সুযোগ পেয়েছি? যাদের অজগর কী, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই, তাদেরকে প্রথম থেকে এমন কুশিক্ষা প্রদানের জন্যই ভবিষ্যতে তারা রাজনৈতিক নেতা বনে অজগরের ন্যায় সর্পিল হয়ে জনগণের প্রতি ধাবমান হয়। অথবা সরকারি কর্মকর্তা হয়ে প্রকল্পের টাকা অজগরের মতো বিশাল ক্ষুধা নিয়ে গিলে ফেলে। অজগরের অর্ধেক হলো অজ অর্থাত্ ছাগ বা ছাগল, যা বহু শিশুর কাছে অতিপরিচিত প্রাণী, যা ক্ষুদ্রতর শব্দ, যার উচ্চারণ অজগর অপেক্ষা সহজতর। অজকে উপেক্ষা করে অজগরকে প্রাধান্য দেওয়া বাংলা শিক্ষার এক চরম ভুল, এটা অস্বীকার করলে বলতে হবে বঙ্গবাসীর চামড়া পুরু। 

বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে দৃষ্টিপাত করা যাক। রাজভাষায় আলোকপ্রাপ্ত মানুষ গরু অপেক্ষা ছাগলের সঙ্গে নিজেকে অধিক সন্নিবিষ্ট জ্ঞান করে বলেই আপন এবং অপরের সন্তান-সন্ততিদের ‘কিড্’ বলে সম্বোধন করে। অভিধানে স্পষ্ট লেখা আছে, কিড শব্দের আক্ষরিক অর্থ ছাগবত্স। এক্ষেত্রে মনুষ্য-ছাগ মিলে-মিশে একাকার। বালক-বালিকাদের ‘কাফ’ জাতীয় সম্বোধন এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।

গরুর দুধের চেয়ে ছাগলের দুধকে অধিক উপকারী জ্ঞান করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, রোজ সকালে এক ঘটি ছাগদুগ্ধ পান না করলে তিনি সত্যাগ্রহে মনোনিবেশ করতে পারতেন না। ছাগের প্রতি বিরূপতার কারণেই বুঝি সত্যের প্রতি আগ্রহ আজ স্তিমিত, যত্পরোনাস্তি ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার কাজে ব্যস্ত আজ কর্মকর্তা ও নেতৃবৃন্দ, তা সচেতন ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করবেন।

পরিশেষে হাজারো দুঃখ-দুর্দশা, করোনা সংক্রমণ, মৃত্যু, অনিশ্চয়তার মধ্যেও ‘দেশে গরু-ছাগলের ঘাটতি হবে না’ বলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে আশ্বাসের বাণী দিয়েছেন, সেজন্য তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

n লেখক :রম্যরচয়িতা