শফিকুর রহমান রয়েল
অধ্যবসায়, অনলসতা ও কর্মক্ষমতার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত চীনের প্রাচীর। সেটি পরিদর্শনের পর যে কেউ চৈনিক জাতির সামর্থ্য বিষয়ক নতুন কোনো প্রশ্ন উত্থাপনে অনীহা দেখাবে এবং এটিই স্বাভাবিক। কালের পরিক্রমায় সেই চীনেরই পরিচিতি আজ ‘বিশ্বের কারখানা’ রূপে। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এখন তাদের সামনে কেবল যুক্তরাষ্ট্র। তাদেরও হটিয়ে অদূর ভবিষ্যতে যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলে দেওয়া যায়। অতিসাম্প্রতিক সব প্রাক্কলন জানান দিচ্ছে যে, ২০৩০ পর্যন্ত যাওয়া লাগবে না, বছর পাঁচেকের মধ্যেই সবচেয়ে বড় অর্থনীতি বনে যাবে তারা। চীনের আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর সহায়ক ভূমিকা ঠিক কতটা, নাকি আদৌ কোনো বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেয়নি, এসব নিয়ে চলতে পারে সুদীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা ও যুক্তিতর্ক। বিশাল জনসংখ্যা আশীর্বাদ না অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে বিষয়ে স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে সর্বশেষ আদমশুমারির রিপোর্টটিতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া জরুরি। কিছুদিন আগে প্রকাশ পাওয়া ২০২০ সালের জনগণনা অনুসারে, সর্ববৃহত্ জনসংখ্যার দেশে মোট জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে হয়েছে ১৪১ কোটি। নানা নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করলে সেটি হয়তো ১৫০ কোটি ছাড়িয়ে যেত অনেক আগেই।
গত ১০ বছরে চীনের বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হচ্ছে শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কালের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। আদমশুমারির এই ফলাফলের পর সেখানে আরো বেশি সন্তান নিতে উত্সাহদানকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বেইজিং সরকারের ওপর ক্রমাগতই চাপ বাড়ছে, যাতে জনসংখ্যা কমে যাওয়া রোধ করা যায়। বিশ্লেষকরা এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছেন, জন্ম-মৃত্যুর বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখার স্বার্থেই জনবল আমদানির কথা ভাবতে হবে। বিশাল জনসংখ্যার কারণে চীনের মোট জনগণনার জন্য প্রতি ১০ বছর অন্তর প্রায় ৭০ লাখ উপাত্ত সংগ্রহকারীকে কাজ করতে হয়। তারা প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। মনে করা হয় যে, চীনের জনসংখ্যার ওপর এই রিপোর্টটিই হচ্ছে সবচেয়ে বিশদ তথ্যভাণ্ডার, যা ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার জন্য একেবারে অত্যাবশ্যক।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান নিন জিঝে জানিয়েছেন, ২০২০ সালে দেশটিতে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। এ সংখ্যা ২০১৬ সালের চাইতে অনেকটা কম। কারণ সে বছর জন্ম নিয়েছিল মোট ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু। এক সন্তান নীতি থেকে দুই সন্তান নীতিতে সরে আসা হয়েছে। এমনকি শর্তসাপেক্ষে কোনো কোনো অঞ্চলে তিন সন্তান গ্রহণকেও বাধা দেওয়া হচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, এক সময়ে কঠোর হস্তে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দমন করা হলেও এখন নানা চেষ্ট সত্ত্বেও প্রজনন হারকে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না? উত্তরটা খুব কঠিন নয়, প্রজননের নিম্নহার চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বাভাবিক ফল। বিশ্বব্যাপী এটি প্রমাণিত সত্য যে, উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতার ফলে জন্মহার নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। চীনের প্রতিবেশী জাপান ও কোরিয়াতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জন্মহার রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে, এমনকি জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। যদিও এ দুই দেশের সরকারই দম্পতিদের বেশি সংখ্যক সন্তান নেবার জন্য আকর্ষণীয় সব প্রণোদনার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।
১৬ থেকে ৫৯, অর্থাত্ এখন পর্যন্ত চীনের কর্মক্ষম জনসংখ্যা হচ্ছে ৮৮ কোটি। নিঃসন্দেহে অঙ্কটা বিশাল, তবে আগের আদমশুমারির চেয়ে ৪ কোটি কম। চীনের কমিউনিস্ট নেতারা অবসরের সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়ে এর একটা অস্থায়ী সমাধান টানতে চাইছেন। কিন্তু চীনের জনসংখ্যার সঙ্গে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যে প্রবলভাবে জড়িত। বিশ্ব বাণিজ্যে আমদানির প্রধান উত্স চীন। বহু শিল্প মূলত চীনর ওপর নির্ভরশীল। তুলনামূলকভাবে সস্তায় পণ্য উত্পাদন করিয়ে নিতেই বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের স্রোত বয় চীনের দিকে। কোম্পানি বহুজাতিক বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের হোক, কিন্তু পণ্য উত্পাদিত হচ্ছে সর্ববৃহত্ জনসংখ্যার দেশে। বিশ্বে এখন এই ধারাই বিদ্যমান। শ্রমিকের প্রাচুর্য্যপূর্ণ সংখ্যায় দরকষাকষির ক্ষমতাটা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। আর তুলনামূলকভাবে সস্তা শ্রমের কারণেই বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের বড় খেলোয়াড় হয়ে ওঠা। এই সুযোগে তারা দেশের প্রায় সব নাগরিককে বের করে আনে দারিদ্র্যসীমা থেকে। টানা ২০-২৫ বছর গড়ে প্রবৃদ্ধি উপভোগ করেছে প্রায় ১০ শতাংশ (এর মধ্যে এক দশকে আবার ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি)। কিছুদিন আগ পর্যন্ত শ্রমঘন সব শিল্পে চীনের ছিল একচেটিয়া রাজত্ব। অনিশ্চয়তার আঁচ লাগার আগেই অবশ্য তারা ঝুঁকতে শুরু করে মাঝারি ও ভারী শিল্পের দিকে। তবে যে কৌশলই তারা অবলম্বন করুক না কেনো, চীনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু তাদের দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে। অর্থাত্ এক সময় অভিশাপ ভাবা হতো যে জনসংখ্যাকে, তা ফের রূপ নেবে আশীর্বাদে।
—বিবিসি নিউজ অনুসরণে
