ঘনঘোর বরিষায়...

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ২৩:২৬

 

এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরিষায়।/ এমন দিনে মন খোলা যায়— /এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে/ তপনহীন ঘন তমসায়

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এ পঙিক্তর মতো বাঙালির মন বর্ষায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে এভাবেই। বিরহী প্রেমিক বর্ষায় ফোটা প্রেমের প্রতীক কদম ফুল হাতে প্রেম নিবেদন করতে চায় প্রেমিকাকে। মনে হয়, এই যেন মাহেন্দ্রক্ষণ। বর্ষাকাল এভাবেই শতশত বছর ধরে আকূল করে এসেছে বাঙালিকে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পর বর্ষা আসে তৃষিত হূদয়ে বারির ধারা নিয়ে। শুধু হূদয়েই নয়, প্রকৃতিতেও বৃষ্টির ধারা ছড়িয়ে দেয় সবুজের পরশ। গাছে গাছে সবুজ কিশলয় গজিয়ে ওঠে—করে প্রকৃতি-বন্দনা। বাংলার সবুজ শ্যামল রূপের যে উপমা—এই বর্ষাতেই তা সার্থকতা পায়। বৃষ্টি যেভাবে মানুষকে আকূল করে তা বোধহয় অন্য কোনো ঋতু তা করে না।

এই করোনাকাল এসে প্রকৃতির রূপ দেখার দিনগুলি যেন হারিয়ে গেছে। ঘরবন্দি আতঙ্কিত, বিরক্তিকর রাতদিন কাটছে মানুষের। এমনকি ঘুরতে যাওয়াও গত প্রায় দেড় বছর ধরে তো একরকম বন্ধই। করোনার প্রথম ঢেউয়ের পরে কিছুদিনের জন্য হোটেল, পর্যটনকেন্দ্রগুলো খোলা হলেও তাদের ব্যবসায়ে জোয়ারের দেখা মেলেনি। তাই, শীতের সময় স্কুল-কলেজ ছুটি হয়ে গেলে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। শিশুদের স্কুল ছুটির পর গ্রামে বেড়াতে যাওয়া কিংবা পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বেড়াতে যাওয়া সেসব দিনও গেছে হারিয়ে। জীবন হয়ে গেছে রংহীন, বিবর্ণ। শুধু করোনাকাল কেন, কংক্রিটের এই শহরে প্রকৃতির রূপের কী আর দেখা মেলে?

এই যে এমন ঘনঘোর বর্ষা প্রকৃতি জুড়ে—সেই রূপ দেখার সুযোগই-বা হচ্ছে কোথায়! তাই স্মৃতিতেই সেই দারুণ দিনগুলোর আনাগোনা। ভ্যাপসা দুঃসহ গরমে হঠাত্ মেঘের দুদ্দাড় ছুটে আসা, দিগন্ত জুড়ে মেঘের কালো ছায়া, দমকা হাওয়ায় ধানের খেতে উথাল-পাতাল দোল দেখে মন অকারণ খুশিতে ভরে উঠতা। তুমুল বৃষ্টিতে  গ্রামের মেঠো পথে আছাড় খেতে খেতে বাড়ির দিকে না ছুটে, দল বেঁধে সবাই ছুটত আমবাগানে। কাঁচা আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। নগরজীবনে এসব স্মৃতি নস্টালজিক করে তোলে।

বর্ষায় যতদূর চোখ যায় দিগন্ত জোড়া ঘন কালো মেঘ নেমে আসে মাথার ওপরে। খোলা প্রান্তরে মেঘের ডাকাডাকি, দুদ্দাড় বেগে নেমে আসা বৃষ্টির রূপ আজও অবাক বিস্ময়ের সৃষ্টি করে মানুষের হূদয়ে। টিনের চালে, দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠে, নদীর স্রোতধারায়—বৃষ্টির ফোঁটা যেন এক উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিলম্বিত রাগের মতো একটানা বাজিয়ে চলছে ধুন। এতে কোনো বিরক্তি নেই। বৃষ্টি, ঘন কালো মেঘ প্রকৃতির বিশালতাকে উপলব্ধি করার জন্য এক অমোঘ টানে আবিষ্ট করে মানুষকে।

বর্ষা আবহমান বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক অভিব্যক্তি। বর্ষা যেন বাংলার প্রাণ। বর্ষায় বাংলার মাঠে মাঠে শস্য বোনার উত্সব শুরু হয়। কবি, সাহিত্যিকদের লেখায় এই বর্ষা ধরা দিয়েছে নানা মাত্রায়। গুরুগুরু মেঘের মাদল বাজিয়ে রিমঝিম বৃষ্টি বাঙালির মনে ছড়িয়ে দেয় নানা মাত্রার অভিব্যক্তি। এই বর্ষা কখনো বিরহ যাতনার উপলক্ষ্য, কখনো সর্বনাশী, সর্বগ্রাসী। মানুষের জীবনের মানচিত্র পালটে দিয়ে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায় বর্ষার প্রচণ্ড রূপ। কিন্তু বারবার প্রতি বছর বর্ষার রুদ্ররূপ ছাপিয়ে প্রতিটি মানুষের মনে এক অমোঘ টানে বর্ষা নিয়ে আসে নতুন দিনের গান।

বিরহী বর্ষা :বিরহ ও বর্ষা কাব্যে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান স্থান দখল করে আছে। বুদ্ধদেব বসু তার এক রচনায় এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “এর প্রধান কারণ বোধহয় কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের সর্বগ্রাসী প্রতিপত্তি। এর উত্সস্থল বাল্মীকি নিশ্চয়ই। ... পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবিরা বর্ষা-বিরহ সমন্বয়টিতেই অর্পণ করলেন তাঁদের মুগ্ধতা ও সৃষ্টিকল্পনা — কেমন আশ্চর্য সফলতার সঙ্গে। ... বৈষ্ণব কবিদের রাধিকা, উজ্জয়িনীর মেয়েদের মতোই, বর্ষার রাত্রে অভিসারে বেরোন; আকাশে মেঘ উঠলে নায়ক-নায়িকার সঙ্গলিপ্সা বর্ধিত হয়; চণ্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, বর্ষার সঙ্গে প্রেম ও বিরহের একটি অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ স্থাপিত হ’য়ে গেছে। এই যে সাহিত্যিক ঐতিহ্য যুগ-যুগ ধ’রে গ’ড়ে উঠলো, তার মধ্যে ‘মেঘদূতে’র প্রভাব অনস্বীকার্য।”

এ চরাচর জুড়ে অঝোর ধারার বৃষ্টি মোহগ্রস্ত করে তোলে। নিঃসঙ্গতা বোধকেও করে তোলে তীব্র। বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি লিখেছেন :এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/ এ ভরা বাদর/ মাহ ভাদর/  শূন্য মন্দির মোর।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষায় বিরহবেদনা নিয়ে লিখেছেন :শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে/ ভুলিও স্মৃতি মম নিশীথ স্বপন-সম/ আঁচলে গাঁথা মালা ফেলিও পথ-’পরে।

কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন : বৃষ্টির কথা থাক, বিরহের কথা বলি/ শুনাই দুজনে বিদ্যাপতির বিষণ্ন পদাবলী,/ বর্ষার কথা থাক, বকুলের কথা বলি/ ঝরা বকুলেই ভরে রাখি এই প্রশস্ত অঞ্জলি।/ আকাশের কথা থাক, হূদয়ের কথা শুনি/ যদিও বিরহ তবু মিলনের স্বপ্নজালই বুনি,

বর্ষায় মানুষের মন কেন এত আকুল হয়ে ওঠে? এ ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে প্রকৃতি বিশারদরা বলছেন, মানুষ প্রকৃতির সন্তান। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারা বনে, জঙ্গলে ছিল। প্রকৃতির বর্ণ-গন্ধ-শব্দ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে ঢুকে গেছে। তাই বর্ষার নিঝুম নিঃসঙ্গতা মানুষকে ব্যাকুল করে। একাকিত্বের জন্ম দেয়। তখন সেই একাকিত্ব ঘোচাতে সে সঙ্গ চায়। যদি তার ভালোবাসার মানুষ দূরে থাকে তখন সে বিরহকাতর হয়ে পড়ে। ঘরে বন্দি একজন মানুষ, বৃষ্টির ছন্দবদ্ধ শব্দ যা তার বংশধারায় কোটি কোটি বছর ধরে মানুষ বহন করছে—তার কারণে সে এমন ছটফট করতে থাকে। এটা প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়।

প্রকৃতি বিশারদরা এও বলছেন, পশুরাও ঋতুভেদে আচরণ পালটায়। আমরা মানুষরা অরণ্য ছেড়ে এলেও প্রকৃতির বাইরে তো নই। সে কারণে মানুষ ঋতুভেদে প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে বর্ষা এক বিশাল প্রভাব রাখে মানুষের মধ্যে। এ সময় বৃষ্টিপাত হয়, প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে, ফুল ফোটে। এসব মানুষকে আলোড়িত করে। সে কারণেই প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য ছেড়ে এলেও প্রকৃতির সেই অমোঘ টানে সংস্কৃতিমান মানুষ বর্ষার রূপ বর্ণনা করে। বর্ণনা করে প্রকৃতির রূপ। কবিতা লেখে। সুরের সঙ্গে প্রকৃতির শব্দের সংযোগ রয়েছে। তাই গানের সুরে, একতারার সুরে বর্ষার রূপ মানুষের মনে আবেশের সৃষ্টি করে।

শুধু বিরহ বা প্রেম নয়, বর্ষার রূপ কবিদের লেখায় নানাভাবে ধরা দিয়েছে। ফররুখ আহমদের ‘বৃষ্টি’ কবিতায় গ্রামবাংলার অনন্য চিত্র ফুট ওঠে :বৃষ্টি এল বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি। পদ্মা মেঘনার/ দু’পাশে আবাদী গ্রামে, বৃষ্টি এল পুবের হাওয়ায়;/ ... রৌদ্র-দগ্ধ ধানক্ষেত আজ তার স্পর্শ পেতে চায়, নদীর ফাটলে বন্যা আনে পূর্ণ প্রাণের জোয়ার।

কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃতির বর্ণনা করেছেন এভাবে :রিমি রিমঝিম রিমঝিম নামিল দেয়া/ দেখি শিহরে কদম বিদরে’ কেয়া/ নামিল দেয়া/।

বর্ষায় সবুজ প্রকৃতির মাঝে অলংকারের মতো ফুটে ওঠে অসংখ্য ফুল। দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, বেলি, বকুল, হাসনা হেনা, জুঁই, কদম ফুলের মাতাল করা গন্ধ ভেসে বেড়ায় প্রকৃতি জুড়ে। বিরহী বর্ষা ফুলের গন্ধ-ব্যাকুল করা মনে কী যে অব্যক্ত দ্যোতনার সৃষ্টি করে তার হদিস পাওয়া ভার।