মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার নামে লাখ লাখ লোককে প্রতারিত করার অভিযোগ রয়েছে ডেসটিনির কর্ণধার রফিকুল আমিনের বিরুদ্ধে। সেই পুরনো ব্যবসার পথেই আবার হাঁটছেন কারাবন্দি এই ব্যক্তিটি। অসুস্থতার নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন্স সেলে বসে এবার কোটি লোককে সহায়তা করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রায় চার হাজার কোটি টাকা পাচারে জড়িত এই ব্যক্তিটি। জেলে বসেই জুম আইডি ব্যবহার করে সেরেছেন একাধিক মিটিং। ঐসব মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন ডেসটিনির এমএলএম ব্যবসায় জড়িত সাবেক কর্মকর্তারা। যাদের অনেকেই পলাতক।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক জুম মিটিংয়ের ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, ভার্চুয়াল সভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে রফিকুল আমিন বলছেন, ‘আমি জেলে বসে স্বপ্ন দেখি মিনিমাম এক কোটি লোককে হেল্প করতে চাই। এর আগে আমি স্বপ্ন দেখতাম বাংলাদেশে এসে দশ লাখ লোককে হেল্প করব। সেটা তো বাস্তবায়ন হয়েইে গেছে। আমি তার চেয়ে বেশি লোককে হেল্প করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি যখন আপনাদের (জুম মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী) সঙ্গে কথা বলি, ট্রেনিং করাই বা কাজ করি সেদিন জেলে আমার খুব ভালো ঘুম হয়। আমি গুনগুন করতে থাকি। সময়টা ভালো কাটে। কিন্তু আপনাদের সঙ্গে একদিন কথা বলতে না পারলে আমি সিক (অসুস্থ) হয়ে যাই। কেন এটা হচ্ছে আমি বুঝতেছি না।’
জানা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের এভাবেই স্বপ্ন দেখিয়ে ৬টি জুম মিটিং কারাগারে বসে সম্পন্ন করেছেন রফিকুল আমিন। অভিযোগ রয়েছে, যিনি দুই দশক আগে ডেসটিনি নামে কোম্পানি খুলে লাখ লাখ মানুষকে প্রতারিত করে এমএলএম ব্যবসার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত সেই অর্থ আবার পাচারও করেছেন। যার কারণে তার বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় ২০১২ সালে দুদক দায়ের করে দুটি অর্থ পাচারের মামলা। এসব মামলায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে অর্থ অন্যত্র স্থানান্তর ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়। গ্রাহকদের সেই অর্থ ফেরত না দিয়ে নয় বছর ধরে জেলে থাকা এই আসামি জুম মিটিং করে আবারো কোটি মানুষকে এমএলএম ব্যবসার নামে ‘হেল্প’ করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। দুই বছর আগে কারাগারে বসেই খুলেছেন ‘ডিটুকে’ নামে নতুন কোম্পানি। সেখানে বসে নিজেই করছেন ব্যবসার তদারকি।
একাধিক জুম মিটিংয়ে দেওয়া বক্তব্যে রফিকুল আমিন আরো বলেন, ‘এমএলএম ব্যবসায় একজন কাজ করে দশজনে খায়-এটা যারা বলেন তারা ফালতু কথা বলেছেন। একজনের অধীনে একজন কাস্টমার কাজ করলে তিনি রয়্যালিটি পান সেটা তো এই ব্যবসায় রয়েছে। আমার বড়ভাই/মেজ ভাই সংসার চালাত, তখন আমরা যারা তাদের উপার্জিত অর্থে খেয়েছি সেটা কি হারাম হয়ে গেছে? একজনে কাজ করলে দশজনে খেলে হারাম হয় এটা ফালতু কথা। এগুলো যারা বলেন তারা জানেন কম। কথায় আছে না অল্প বিদ্যা ভয়ংকরি।’ তিনি বলেন, ‘আমি এই মিটিং করছি শুধু একজন লোকের অনুরোধে। তিনি আমাকে বলেছেন, স্যার প্রচুর লোক আছে। তারা হতাশ। আপনি তাদের সঙ্গে সরাসরি জুম মিটিং করেন। লাভ হবে। এরপরই আমি মিটিং করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি গ্রাহক সেবাকে থানা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাচ্ছি যে গ্রাহককে সেবা দেবে সেই লোকটি যেন কাস্টমারকে চেনে। আমার মত অন্যান্য কোম্পানির মালিক যদি জেলে থাকত তাদের ব্যবসা এতদিনে বন্ধ হয়ে যেত।’
গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে জড়িত জিএম তুষার আহমেদের নারী কেলেংকারির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একজন আলোচিত বন্দির জুম মিটিংয়ের ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ে কারা কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে ১৭ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কারাপ্রশাসন।
প্রসঙ্গত, ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রদানের শর্তে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমিনকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছিলো আপিল বিভাগ। তার আইনজীবীদের এমন প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে এই আদেশ দেয় আপিল বিভাগ। প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও ওই আদেশ প্রতিপালন করেননি রফিকুল আমিন। পরে অসুস্থতার গ্রাউন্ডে নতুন করে জামিন চান তিনি। ঐ আবেদনের শুনানিকালে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আসামির উদ্দেশ্যে আপিল বিভাগ বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ। এই অর্থ কাদের? আমরা তো আপনাকে শর্তসাপেক্ষে জামিনের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি সেটা গ্রহণ করেননি? আপনি তো প্রতিজ্ঞা করেছেন গ্রাহকের এক পয়সাও ফেরত দেবেন না।’ পরে তার জামিন আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়।
