গল্পকথায় পদার্থবিজ্ঞান
মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ,সিলেট
গতকালের পর
নীলকান্তবাবু বললেন, আসলে নভোরশ্মি, কিন্তু নভো মানেই তো আকাশ, তাই আকাশ রশ্মিই বললাম। ইংরেজিতে এর নাম কসমিক রে (Cosmic Ray)।
আকাশ বলল, এটি মহাকাশের কোন জায়গা থেকে উত্পন্ন হয়?
এ নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে, বললেন নীলকান্তবাবু। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জিনস (Jeans)ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে সূর্য ও অন্যান্য দূরবর্তী নক্ষত্রে প্রচণ্ড উত্তাপের ফলে পরমাণু থেকে প্রোটন, ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বেগ খুব বেশি থাকায় ইলেকট্রন ও প্রোটন একসাথে মিশে ক্ষয় হতে থাকে এবং প্রচণ্ড শক্তির উদ্ভব হয়। এই শক্তিই নভোরশ্মি রূপে বিকিরিত হয়। এদিকে বিজ্ঞানী ফার্মির মতে ছায়াপথে দ্রুতগামী আয়ন এই রশ্মির জন্য দায়ী, প্রাথমিক গতিসম্পন্ন আয়ন চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যাবার সময় এর প্রভাবে ত্বরান্বিত হয়ে প্রচুর শক্তি উত্পন্ন হয়।
চৌম্বক ক্ষেত্র কোথায় পাবে? বলল অণু। আয়নসমূহের গতি ও ছায়াপথের ঘূর্ণনের জন্য ছায়াপথে চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, বললেন নীলকান্তবাবু।
কিন্তু এই রশ্মি আবিষ্কার করলেন কে? সীমা বলল।
নীলকান্তবাবু বললেন, ১৮৯৯ সালে জে এলস্টার (J Elster) ও এইচ গাইটেল (H Geitel) এবং ১৯০০ সালে সি. টি. আর উইলসন (C.T.R. Wilson) ল্যাবরেটরিতে স্বর্ণপাত তড়িত্বীক্ষণ যন্ত্রের পরীক্ষা করার সময় লক্ষ করেন, এই যন্ত্রকে চার্জিত করে অন্তরিত অবস্থায় রাখা হলে এর আধান কমে যায়। তাঁরা ভাবলেন কোনও অনুপ্রবেশকারী অদৃশ্য রশ্মি যন্ত্রটির মধ্যস্থিত বায়ুকে কিছুটা আয়নিত করার ফলে বায়ু আংশিকভাবে পরিবাহী হয়ে উঠে, ফলে আধান কমে যায়।
আকাশ বলল-কিন্তু এমনও তো হতে পারে, ল্যাবরেটরিতে কোনও তেজস্ক্রিয় মৌল আছে, যা থেকে উত্পন্ন গামা রশ্মি দ্বারা আয়নিত হয়ে যাচ্ছে এবং চার্জ কমে যাচ্ছে।
নীলকান্তবাবু বললেন-তা-ও হতে পারত। কিন্তু ১৯১২ সালে বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রান্সিস হেস (V.F.Hess) ও ডবিউ কোলহোস্টার (W.Kolhoster) তড়িত্বীক্ষণ যন্ত্র হালকা গ্যাস ভর্তি বেলুন দিয়ে আকাশে পাঠিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন, সেখানেও চার্জ কমে যাচ্ছে। যতই উপরে উঠছে বেলুন, ততই চার্জ কমে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হলো, আকাশ থেকে আসা কোনও রশ্মির কারণেই চার্জ কমে যাচ্ছে।
একটু থেমে নীলকান্তবাবু আবার শুরু করলেন- ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী মিলিক্যান এই নতুন রশ্মি সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, ফলে গবেষণা কার্য বন্ধ রাখতে হয়। পরে যুদ্ধ শেষ হলে ১৯২২ সালে মিলিক্যান সহযোগীদের সাথে নিয়ে আরও উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে গভীর হ্রদ, পর্বত শিখর, আকাশের অনেক উপরে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে, পৃথিবীর কোনও অংশে নয়, বহু দূরের কোনও অংশ থেকেই এই রশ্মি আসছে। পরে ১৯২৫ সালে মিলিক্যানই এই রশ্মির নাম দেন কসমিক রে বা নভোরশ্মি। নভোরশ্মি দুই ধরনের হতে পারে। প্রাথমিক রশ্মি এবং উদ্ভূত রশ্মি বা জাত রশ্মি।
উদ্ভূত রশ্মিটা কী রকম? বলল অণু।
প্রাথমিক রশ্মিটা আগে বলে নিই। মহাশূন্য থেকে যে সকল মৌলিক কণা রশ্মির আকারে বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে আপতিত হয়, সেগুলো হচ্ছে প্রাথমিক রশ্মি। এই রশ্মির ৯২ ভাগই হচ্ছে প্রোটন, ৭ ভাগ আলফা কণা বাকি অন্যান্য। এই সমস্ত কণা প্রায় আলোর বেগে চলে। তবে খুব কম সংখ্যক রশ্মিই বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে আসতে পারে। আর জাত রশ্মি হচ্ছে প্রাথমিক রশ্মির সাথে বায়ুমণ্ডলের কণার সংঘর্ষের ফলে যে রশ্মি পাওয়া যায় তা। একটি প্রাথমিক রশ্মির প্রোটনের সাথে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনের সংঘর্ষের ফলে নিউক্লিয় ঝর্ণার সৃষ্টি হয় এবং বহুসংখ্যক নিউট্রন, প্রোটন, আলফা কণা, ফোটন ইত্যাদির সৃষ্টি হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠে এই জাত রশ্মির মধ্যে ৭৫% মিউমেসন, ২৫% ইলেকট্রন, পজিট্রন ইত্যাদি থাকে।
বিন্দু বলল-নিউক্লিয় ঝর্ণা আবার কীরকম, মাধব কুণ্ডের ঝর্ণার মতো?
নীলকান্তবাবু বললেন-অনেকটা তা-ই। তবে মাধব কুণ্ডের ঝর্ণায় পানি পড়ে। এই রশ্মির ঝর্ণায় তো আর পানি পড়বে না। নভোরশ্মির দ্রুতগামী ইলেকট্রনের সাথে জড়পদার্থের সংঘাতেই ঝর্ণার সৃষ্টি হয়। একটি ইলেকট্রন যখন পদার্থের কোনও নিউক্লিয়াসের পাশ দিয়ে যায় তখন এর ত্বরণের ফলে বিকিরণ হয়। ফোটনের আকারে এই বিকিরণ আর একটি নিউক্লিয়াসের পাশ দিয়ে যাবার সময় একই সাথে একটি ইলেকট্রন ও একটি পজিট্রন উত্পন্ন করে। এই জোড়া আবার নতুন ইলেকট্রন-পজিট্রন সৃষ্টি করে। এভাবে অসংখ্য জোড়ার সৃষ্টি হয়ে ঝর্ণা উত্পন্ন করে। নভোরশ্মির ঝর্ণা। ১৯৩২ সালে বি.রসি (B.Rossi) এবং ১৯৩৩ সালে পি.এম.এস.ব্লাকেট (P.M.S.Blacket) ও ওকায়ালিনি (Occhialini) বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে নভোরশ্মির ঝর্ণা আবিষ্কার করেন। পরে ১৯৭৩ সালে আয়ারল্যান্ডে ভারতীয় বিজ্ঞানী এইচ.জে ভাবা (H.J.Bhaba)ও ডবিউ হাইটলার (W.Heitler) এবং আমেরিকায় জে.এফ কার্লসন (J.F Carlson) এবং জে.আর ওপেন হাইমার (J.R.Oppenheimer) নভোরশ্মির ঝর্ণা সম্পর্কে কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রদান করেন।
রেখা বলল-পৃথিবীর সব জায়গায় কি সমপরিমাণে এই রশ্মি নির্গত হয়?
না, বললেন নীলকান্তবাবু। ১৯৩৫ সালে বিজ্ঞানী মিলিক্যান ও কম্পটন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে নভোরশ্মির তীব্রতা নির্ণয় করতে চেষ্টা করেন। তাঁরা দেখেন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০ কিলোমিটার ঊর্ধ্বে অক্ষাংশের সাথে এই রশ্মির তীব্রতার তারতম্য আছে। মেরু অঞ্চলে এই রশ্মি বেশি থাকে।
