মেঘাবৃত আকাশ, আড়ালে সূর্য

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ২১:৪০

বর্তমান সময়টাকে আমরা ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন বলে গণ্য করতে পারি। ভবিষ্যতের সমাজ ও সভ্যতা কেমন হবে, তা এখন বলা মুশকিল। তবে অনুমান করা যায় পুঁজিবাদীরা যত শক্তিশালী হবেন, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধক্ষমতাও ততটাই বাড়বে। বিশ্বে ন্যাশন-স্টেটের দেওয়াল অনেকটাই ভেঙে যাবে। কার্ল মার্কস যে স্টেটসলেস বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষ অত্যন্ত কাছাকাছি হবে এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রীদের যুদ্ধ অনেক শক্তিশালী হবে

ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া একবার তার রাজনৈতিক মঞ্চে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবী ক্রমশই ছোট হইয়া আসিতেছে। আগে যেখানে যাওয়ার কথা কল্পনাও করি নাই, সেসব স্থানে এখন যাওয়া কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার মাত্র। আটলান্টিকের ওপারে কথাবার্তা বলিতেও কোনো অসুবিধা নাই। সব মানুষের মধ্যে জানাজানি বাড়িতেছে। মনে হয় ক্যাপিটালিস্টরা যতই চেষ্টা করুক, মানুষকে ভাগ করিয়া, তাদের দেশকে ভাগ করিয়া চিরকাল দাস করিয়া রাখিতে তাহা পারিবে না। একদিন প্রকৃতির অভিশাপে তাহাদের সব চেষ্টা লন্ডভন্ড হইয়া যাইবে। হয়তো সকল বিশ্বের মানুষ এক কাতারে আসিয়া দাঁড়াইবে। কমিউনিস্টরা যাহা চাহে, তাহাও হইবে। অর্থাত্, পৃথিবীর মানুষের মধ্যে একধরনের সমতা নামিয়া আসিবে।’ আমি জানি না, আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগে মানিক ভাই আজকের পৃথিবীর অবস্থাটা কী করে আন্দাজ করেছিলেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবী আজ কোভিড-১৯-এর গ্রাসে পতিত। শত শত মানুষ রোজ মারা যাচ্ছে। হাসপাতালে একই শয্যায় শুয়ে কোটিপতি এবং একজন গরিবের মৃত্যু হচ্ছে। এই রোগের ভয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে যেমন টিকা নিতে হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের এক সলিমুদ্দিনকেও সেই টিকা নিতে হয়েছে। বাংলাদেশে যেমন রোজ শতাধিক লোক মারা যাচ্ছে, তেমনি যাচ্ছে ব্রিটেন এবং আমেরিকায়ও। সম্প্রতি ইউরোপের অস্ট্রিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে দারুণ কড়াকড়ির জন্য এই রোগের প্রকোপ একটু কম। কিন্তু সারা বিশ্ব এই রোগ থেকে শিগগির মুক্ত হবে, তার কোনো আভাস নেই। এক সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘কোভিডের দরুন ভবিষ্যতের পৃথিবীতে দুটি অসম ঘটনা ঘটবে। পুঁজিপতিরা আরো বিত্তশালী হবে। তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভেতরে যে সমতা আসবে, তাতে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বর্তমান শ্রেণিভেদ অনেকটাই লুপ্ত হয়ে যাবে। ধনী ও গরিবের ভেতরে সামাজিক অবস্থানে একটা সমতা তৈরি হবে।’ মনে হয় এই সমাজবিজ্ঞানীর কথা সত্য হবে। অতীতে পুঁজিপতিরা বিভিন্ন মহামারির সময় মানুষের জীবনকে দাম না দিয়ে তাদের চিকিত্সার নামে দুর্নীতি করেছেন এবং ওষুধের ব্যবসায় মনোপলি তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লুটেছেন। অবিভক্ত বাংলাদেশে একটা পুঁজিপতি শ্রেণি তৈরি হয়েছিল ’৫০-এর দুর্ভিক্ষের সময়। বাজারের ধান-চাল গুদামজাত করে রেখে পরে অতিরিক্ত দামে বিক্রির লোভে ৫০ লাখ মানুষকে অনাহারে হত্যা করা হয়। তখনকার ব্রিটিশ ভারতের বড়লাটের খাদ্য উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে অনাহারে প্রতিটি মৃত্যুতে খাদ্য ব্যবসায়ীরা হাজার টাকা করে মুনাফা করেছেন।’ অবিভক্ত বাংলায় যখন ম্যালেরিয়া মহামারিতে লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে, তখন পাশ্চাত্য কোম্পানি কুইনাইন তৈরি করে একদিকে মানুষকে বাঁচিয়েছে, অন্যদিকে এই ওষুধ নিয়ে মনোপলি ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন।

বর্তমান করোনা মহামারির সময়েও দেখা যাচ্ছে প্রথমে ফাইজার কোম্পানি এই ওষুধ সর্বত্র বিক্রি করেছে। কোভিডের টিকা নিয়েও অব্যবস্থা ও দুর্নীতি কম হয়নি। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে তো এই মহামারিকে আমলই দেননি। আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী। তারপর যখন এই টিকাদান অত্যাবশ্যক বলে দেখা গেল, তখন ট্রাম্প এই ভ্যাকসিন নিয়েও সাদাকালোর পার্থক্য তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। তার চেষ্টা ছিল এই টিকা পাওয়ার ব্যাপারে সাদারা অগ্রাধিকার পাবে। তার এই গোপন প্রচেষ্টা সফল হয়নি। বাইডেন প্রেসিডেন্ট পদে এসে এই টিকাদান সাদাকালো-নির্বিশেষে মার্কিন নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। বাংলাদেশে হাসিনা সরকার যদিও কোভিড প্রতিহত করার ব্যাপারে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, কিন্তু এক ব্যক্তির হাতে প্রথমে এই ওষুধ আমদানির দায়িত্ব দেওয়ায় অব্যবস্থা কম হয়নি। সেই ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা মুনাফা করেছেন। ভেজাল টিকা প্রদান এবং এই রোগের চিকিত্সার নামে জুয়াচুরি করে একজন ধনপতি এখন জেলে। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ কম নয়। এই দুর্নীতি প্রকাশ করতে গিয়ে একটি পত্রিকার রিপোর্টারকে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। ভারতে এই যে ভয়াবহ মৃত্যুর তাণ্ডব, তার মূলেও আছে ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি এবং মোদি সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। কোভিডের প্রকোপের সময়ে দেশের পাঁচটি রাজ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের এবং গঙ্গাস্নান ও কুম্ভমেলার অনুষ্ঠানে অনুমতি দেওয়া মোদি সরকারের পক্ষে ছিল এক দারুণ ভুল পদক্ষেপ। তাছাড়া ভারতের অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা কোভিড মহামারির সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটেছেন। পৃথিবী যদি একদিন কোভিড-মুক্ত হয়, তখন দেখা যাবে এই মহামারিকে মূলধন করে আরো প্রভাবশালী একদল পুঁজিপতি তৈরি হয়েছে। তারা পৃথিবীর রাষ্ট্রব্যবস্থায় অবশ্যই প্রভাব বিস্তার করবে এবং ধনতান্ত্রিক সমাজ আরো শক্তিশালী হবে। পুঁজিপতিরা যে বিশ্বায়ন তৈরি করেছিলেন তাদের বাজার অর্থনীতির স্বার্থে, কোভিড সেই বিশ্বায়ন আরো বড় করে দেবে। কিন্তু ঐ সমাজবিজ্ঞানী একটি আশার কথা বলেছেন। কোভিডের প্রকোপে ধনী-গরিব সবাইকে হাসপাতালে একই শয্যায় মারা যেতে হয়েছে। টিকা নিতে হয়েছে সর্বজনীনভাবে। কারণ, গরিবেরা রোগগ্রস্ত হলে তাতে ধনীরাও সংক্রমিত হবে। এই রোগ ধনী-গরিব বাছাই করেনি। সবাইকে সমানভাবে আক্রমণ করেছে এবং এই রোগ বিস্তারের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব দেশেই মানুষের মধ্যে একটা সমতা এনেছে। রাস্তার মজুর এবং একজন ধনী ব্যক্তিকেও একই কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছে। এক্ষেত্রে শ্রেণিভেদ করে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা যায়নি।

আমাদের ধর্ম বলে, রোজ হাসরের দিন ধনী-গরিব চেনা যাবে না। কারো বিত্ত কোনো কাজে আসবে না। একই জমিনে, একই আকাশতলে তাদের দাঁড়াতে হবে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায়। পৃথিবীর আবহাওয়া থাকবে উত্তপ্ত। লক্ষ করলে মনে হবে বর্তমান সময়টা বুঝি সেই রোজকেয়ামত বা ডুমস ডের আভাস। কোভিড মানুষকে টিকা গ্রহণের জন্য এক কাতারে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে পৃথিবীর আবহাওয়া ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে সব দেশের মানুষ আবার এই উষ্ণতা ও প্রকৃতির দূষণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হচ্ছে প্রচুর। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত ক্ষতি থেকে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকে রক্ষার আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য নেত্রী। এক সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘এই কোভিডের প্রকোপ হ্রাস পেলে পৃথিবীতে একটা নতুন সমাজ গড়ে উঠবে। বর্তমান সময়টাকে আমরা ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন বলে গণ্য করতে পারি। ভবিষ্যতের সমাজ ও সভ্যতা কেমন হবে, তা এখন বলা মুশকিল। তবে অনুমান করা যায় পুঁজিবাদীরা যত শক্তিশালী হবেন, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধক্ষমতাও ততটাই বাড়বে। বিশ্বে ন্যাশন-স্টেটের দেওয়াল অনেকটাই ভেঙে যাবে। কার্ল মার্কস যে স্টেটসলেস বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষ অত্যন্ত কাছাকাছি হবে এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রীদের যুদ্ধ অনেক শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যতে ঐ সমাজের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি অনেক বদলে যাবে।’ কিন্তু ইউরোপের কোনো কোনো চিকিত্সাবিজ্ঞানী মনে করেন, পৃথিবী সম্পূর্ণভাবে এই মহামারিমুক্ত হবে না। পৃথিবীর সব অধিবাসীকে টিকা দিলেও যক্ষ্মা ও ক্যানসারের মতো এই করোনার বীজ থেকে যাবে। একটা সিজন বেছে নিয়ে এই রোগ ঘুরে ঘুরে আসবে—যেমন আসে বসন্ত, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি। মানুষকে প্রতি বছরই রোগ প্রতিষেধক টিকা নিতে হয়। কোভিডের জন্যও ভবিষ্যতে বছরে বছরে টিকা নিতে হবে।

মানবসমাজের এই গুণগত পরিবর্তন এবং তার সভ্যতায়ও একটা পরিবর্তন ঘটাবে। আজকের সভ্যতা ধনতান্ত্রিক চরিত্রের। এই চরিত্র থাকবে না। কার্ল মার্কসের কথাই সত্য হবে। বিশ্ব এক নতুন শ্রেণিহীন সমাজ ও সভ্যতা বিকাশের পথে এগিয়ে যাবে। ধর্মের প্রভাব কমবে। ধর্মান্ধ রাজনীতির বর্তমানে যে প্রভাব, তা নতুন বিশ্ব সমাজে থাকবে না। বিজ্ঞান মানুষের সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করবে। করোনামুক্ত ভবিষ্যতের সমাজে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ নির্মূল না হলেও প্রকোপ কমবে। এশিয়া ও আফ্রিকার কোনো কোনো দেশ অর্থনৈতিক উন্নতিতে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, পশ্চিমা গণতন্ত্রের, বিশেষ করে মার্কিন পুঁজিবাদের এই পতনের যুগে চীন ক্রমশ পৃথিবীতে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করবে। কিন্তু এই সম্ভাবনাও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। আমেরিকার পর হয়তো বিশ্ব ধনতন্ত্র থাকবেই না। থাকলেও ইউরোপ অথবা এশিয়ার কোন দেশ তার নেতৃত্ব নেবে তা বলা মুশকিল। একসময় জাপানের অর্থনৈতিক উন্নতিতে অনেকেই মনে করেছিলেন আমেরিকার পর পশ্চিমা ধনতন্ত্রের নেতা হবে এশিয়া আর জাপান। তা হয়নি। চীন দ্বিতীয় অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হিসেবে মাথা তুলেছে। পৃথিবীর পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশের কায়দায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির পচনশীলতার কারণেই চীনের আধিপত্য বেশি দিন স্থায়ী হবে না। এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আয়ু প্রায় ১০০ বছর পার হতে যাচ্ছে, কিন্তু চীনের কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যবাদ ৫০ বছরও আয়ু পাবে না। সমাজতন্ত্র অবশ্যই ধনতন্ত্রের সঙ্গে সংগ্রামে জয়ী হবে। কোনো একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ প্রবল শক্তিশালী হয়ে পচনশীল ধনতন্ত্রকে আরো ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সত্য হবে তা আমি জানি না, কিন্তু সারা বিশ্বে যে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, এই ধ্রুব সত্যটি জানি।

পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করে বড় বড় যুদ্ধ। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তরও এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। অবিভক্ত বাংলাদেশে নারীর কোনো প্রকার স্বাধীনতা ছিল না। নারীর অধিকার বলতে আমরা যা বুঝি, তা ছিল না। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার নারীকে খাদ্যের অন্বেষণে ঘরের বাইরে বের হয়ে আসতে হয়েছে। কলকারখানায় কাজ করতে হয়েছে। একই সময়ে মহাযুদ্ধ তাদের ঘর ভেঙেছে। স্বামী গেছে যুদ্ধে, স্ত্রীকেও ঘরের বাইরে বেরোতে হয়েছে সংসার চালানোর তাগিদে। ’৪৭-এর ভারত ভাগের পর লাখ লাখ নারীকে বাস্তু হারিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যেতে হয়েছে। তাতে তাদের গৃহবন্দি জীবনের অবসান হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানাগুলো নারীর শ্রমে টিকে আছে। এই নারী শ্রমিকদের জীবনেও আগের সংসারের শেকল বাঁধা নেই। শেখ হাসিনার শাসনামলে নারীর ক্ষমতায়ন নীতি গ্রহণের ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে এখন নারী আসীন। এটা ক্রমশ ভবিষ্যতের সমাজ-সভ্যতার চেহারাই পালটে দেবে। শুধু বাংলাদেশের নয়, এশিয়া-আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও এই পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। এককালে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সেই সমাজকে উচ্ছেদ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তৈরি হয় এবং শত শত বছর ধরে বিশ্বে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ স্থায়ী হয়ে বসেছে। নারী অধিকার রক্ষায় কিছুকাল আগেও বহু নারী আত্মদান করেছেন। ব্রিটেনে শুধু নারীর ভোটাধিকার আদায়ের জন্য তাদের আত্মদান করতে হয়েছে। তাদের আত্মদানের ফলে সারা পৃথিবীতে নারীর অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে। নারী এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ জন্যই কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, কোভিড-পরবর্তী সমাজে নারীর প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ফিরে না এলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর আগের মতো থাকবে না। সমাজে পুরুষ ও নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

করোনা-পরবর্তী সমাজে পশ্চিমা সভ্যতার অঙ্গ করমর্দন, এশিয়ার সমাজগুলোতে প্রচলিত কোলাকুলি, সভা-সমিতিতে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসা, মিছিলে মিটিংয়ে পরস্পরের খুব কাছে থাকা হয়তো উঠে যাবে। সেক্ষেত্রে পারস্পরিক কুশলধ বিনিময়ের ক্ষেত্রে নতুন সামাজিক প্রথা উদ্ভাবিত হতে পারে। হয়তো মুসলমানদের দূরে দাঁড়িয়ে সালাম জানানো অথবা হিন্দুদের যুক্তকর নমস্কার নিয়ম হিসেবে প্রচলিত হবে। ব্রিটেনে এখনই দেখা যাচ্ছে, সাদা সাহেবেরা অনেকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত না বাড়িয়ে দুই হাত যুক্ত করে নমস্কারের ভঙ্গিতে অন্যকে সম্মান জানাচ্ছেন। কেউ কেউ সালামও বলছেন। ভবিষ্যতের এই সমাজ আমরা হয়তো কল্পনা করতে পারি, কিন্তু সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না। তবে একটি ব্যাপারে সব সমাজবিজ্ঞানী একই মত পোষণ করেন যে কোভিড মানবতাকে ধ্বংস করতে পারবে না। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে মানবতা বারবার জয়ী হয়েছে। এবারও হবে। বর্তমানের মৃত্যুযজ্ঞের পর আমরা সেই নতুন সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে অবশ্যই আশাবাদী থাকতে পারি।

n লন্ডন, ৩ জুলাই , শনিবার, ২০২১।

পুনশ্চ: ৩ জুলাই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদতবার্ষিকী। এই দিনে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তার স্মৃতির প্রতি অভিবাদন জানাই।