পরিবর্তন আসুক দৃষ্টিভঙ্গিতে

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ২১:৪১

আদিম যুগে সামাজিক ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ ভেদাভেদ বিশেষভাবে ছিল না। সে সময় নারী ও পুরুষ উভয়েই ঘরে-বাইরে কাজ করত। শুধু নারীর কাজ কিংবা পুরুষের কাজ বলে সে সময় শ্রেণিবিভাগ করা হতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে সমাজের কিছু শ্রেণির মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এলো। তারা ভাবল, যেহেতু নারীরা সন্তান জন্মদানে ভূমিকা রাখে, সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য তাদের ঘরেই থাকা উচিত। বাইরের কাজ পুরুষেরা করলেই যথেষ্ট। চারদেওয়ালের মাঝে বন্দি হতে শুরু করল নারী। সমাজের যাবতীয় কঠিন নিয়ম-কানুনগুলো নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। নারীরাও ভাবতে শুরু করল, ঘরের কাজ, সন্তান দেখাশোনা, অল্প বয়সে সংসারজীবন শুরু করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। এসবের বাইরে তাদের আর কোনো জীবন নেই এবং থাকতে পারে না। মানুষ হিসেবে তারাও যে নিজেদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেটাই যে স্বাভাবিক—এ বিষয়টিই তারা ভুলে যেতে লাগল। নারীসমাজের সংকটময় সময়ে বেগম রোকেয়া, কামিনী রায়ের মতো গুণী ব্যক্তিত্বরা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। তারা নারীর সামনের অদৃশ্য পর্দা সরিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও দাসত্ববোধের যে ব্যাপারটা নারীর মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি পুরোপুরি চলে যায়নি।

কারো নারী কিংবা পুরুষ হওয়াটা তার নিজের ওপর নির্ভর করে না। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি বিষয়। প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। শুধু লিঙ্গের ভিত্তিতে সে নারী বলেই যে অধিকারগুলো হারাবে এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে পুরুষেরা ছোটবেলা থেকেই জেন্ডার সুপ্রিমেসির মতো ভ্রান্ত একটি ধারণা নিয়ে বড় হয়, তারা বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে নিজেদের পাশে সমমর্যাদায় আসীন হতে দেখতে অস্বস্তি বোধ করে। কর্মক্ষেত্রে এই বিষয়ের বেশ প্রভাব রয়েছে। কিছু কিছু পুরুষ নারীদের হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। তারা নিজেদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার আগে নারীদের কী কী ধরনের অদক্ষতা থাকতে পারে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও নারীদের পদন্নোতি দেওয়া হয় না। বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে প্রায় ৫০ ভাগ কর্মী নারী, অথচ কর্মক্ষেত্রে তাদের অনেক বঞ্চনা সহ্য করতে হয়, শিকার হতে হয় যৌন হয়রানির। সমাজে নারীর স্বাভবিকভাবে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। নারীর পোশাক আর চালচলনের সঙ্গে সমাজের একশ্রেণির পুরুষ ‘চরিত্রের’ মানদণ্ড করে ফেলে। বিষয়টি এমন দাঁড়ায়, যেন পোশাকই নারীর চরিত্রের সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, যেসব নারী ঘরে থাকে তারাও সমালোচনার বাইরে যেতে পারেন না। বরং তাদের প্রতি সেই সব পুরুষের দ্বারা বৈষম্য কিংবা হয়রানি তুলনামূলক বেশি হয়। সমাজের আরেক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা সাংসারিক কাজকর্মকে কোনো কাজই মনে করে না। এমনকি একশ্রেণির নারীও বিষয়টিকে এভাবেই মেনে নিয়েছে। এই ধারণা কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি। বহু বছর ধরে এমন অসংখ্য ভুল ধারণা নারীর অবচেতন মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে মানুষকে গৃহবন্দি সময় কাটাতে হচ্ছে। এই সময়ে দেশে পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, করোনাকালীন বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা সাধারণ সময় থেকে তুলনামূলক বেশি। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে যেসব নারী বাধ্য হয়ে বিবাহবিচ্ছেদের পথে হেঁটেছে, সেই সব নারীকেও উলটো দোষারোপ করা হয়েছে। পাশপাশি স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার কারণে বাল্যবিবাহের হারও বেড়ে গেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি নারীর জন্য কঠিন পরীক্ষারূপে আবির্ভূত হয়েছে।

সমাজে চলমান নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সার্বিকভাবে দেশের প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আদিম যুগ থেকে চলে আসা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং একে অন্যের সহযোগী। তাই কর্মক্ষেত্র, পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রতিটি জায়গাতেই নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারী কেবল ভোগ্যবস্তু এবং গৃহই তার একমাত্র স্থান—এ ধরনের বর্বর, প্রাচীন চিন্তাভাবনার পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এলেই মাথা তুলে দাঁড়াতে পাড়বে নারী সমাজ।

 লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়