পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের বাস্তবায়ন

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ২১:৪১

পৃথিবীতে সবচেয়ে আপনজন বাবা-মা। প্রত্যেক বাবা-মা নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বড় করে একসময় তাদের কাছেই বোঝা হয় যায়। তাদের অবস্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা পরিবারের বাইরে। এ বিষয়ে আমাদের দেশে আইন থাকলেও দিনে দিনে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশে পিতা—মাতার ভরণপোষণের জন্য আইন রয়েছে পিতা—মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩। ভরণপোষণ বলতে পিতামাতার সব মৌলিক চাহিদা যেমন—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। এই আইনের ধারা ৩, উপধারা ‘ক’ অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। উপধারা ‘খ’ অনুযায়ী একাধিক সন্তান থাকলে সকলে মিলে আলোচনার মাধ্যমে পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করবে। ‘গ’তে বলা হয়েছে, পিতামাতাকে একই সঙ্গে একই স্থানে অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ‘ঘ’তে বলা হয়েছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের আলাদা বা কোনো বৃদ্ধনিবাসে থাকার জন্য বাধ্য করা যাবে না এবং উপধারা ‘ঙ’ অনুযায়ী নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে পিতামাতার এবং নিয়মিত চিকিত্সাসেবা প্রদান ও পরিচর্যা করবে। ‘চ’তে বলা হয়েছে, নিয়মিত সাক্ষাত্ করবে। এবং ‘ছ’তে বলা হয়েছে, পিতামাতা যদি আলাদা থাকেন, সন্তানদের আয় অনুযায়ী যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। এবং ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পিতামাতা না থাকলে দাদা-দাদি বা নান-নানির ভরণপোষণ পিতামাতার ভরণপোষণ বলে গণ্য হবে। এবং যদি এসব দায়িত্ব পালন না করা হয়, তাহলে রয়েছে দণ্ড। ধারা ৫ নম্বরে বলা আছে, কোনো সন্তান যদি ৩ ও ৪ নম্বর ধারার অমান্য করে, তাহলে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এবং আরো বলা আছে, যদি কোনো সন্তানকে তার পরিবারের কেউ বা কোনো আত্মীয় বাধা প্রদান করে বা অসহযোগিতা করে, তাহলেও একই দণ্ডে দণ্ডিত হবে। ছেলেমেয়ে উভয়েই এ দায়িত্ব নিতে বাধ্য। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও আমরা সমাজের করুণ চিত্র দেখতে পাই। অনেক বাবা-মায়েরই জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। তখন আর বৃদ্ধ পিতামাতার আয়রোজগারের ক্ষমতা বা কাজের ক্ষমতা থাকে না। তারা পরিবারের জন্য হয়ে যায় বোঝা। তখন ভরণপোষণ দূরে থাক, একনজর দেখার জন্য কাতর হয়ে থাকে সন্তানদের।

প্রায়ই বিভিন্ন পত্রপত্রিকা বা সংবাদে দেখা যায়, বৃদ্ধ মা বা বাবার জায়গা হচ্ছে না পরিবারের সঙ্গে। ঠিকমতো জুটছে না তিনবেলা খাবার। মিলছে না মাথার ওপরের ছাদ। করুণ ও মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। ফেলে যাচ্ছে রাস্তায়। পরোয়া করছে না আইনের। আবার অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা জানে না এ আইনের কথা। আইন থাকলেও তারা বিভিন্ন অন্যায় ও অবিচারের শিকার হচ্ছে আইনের যথেষ্ট প্রয়োগের অভাবে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিকতা কিংবা আইনের কারণে বৃদ্ধ বাবা-মাকে সঙ্গে রাখলেও করছে না ঠিকমতো পরিচর্যা। পিতামাতার ভরণপোষণের বিষয়টি খুবই মানবিক একটি বিষয়। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নজদারি রাখা এবং আইনকে আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা ও আইনের হস্তক্ষেপ বাড়ানো প্রয়োজন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়