জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর চলতি বছর আরো পরের দিকে দায়িত্ব ছাড়ছেন। তার সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ইইউর ঋণের মারাত্মক সংকট, আরব বসন্ত শুরুর পর ইউরোপ অভিমুখে অভিবাসীর ঢল, ব্রেক্সিট বা ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ইউরোপের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে দূরত্ব তৈরির মতো অনেকগুলো ঘটনা ঘটে মারকেলের জমানায়। ইইউর ইতিহাসে একসঙ্গে এত চ্যালেঞ্জ কখনো তৈরি হয়নি।
বর্তমান ইইউ নেতৃবৃন্দের মধ্যে মারকেলই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন। ২৪ ও ২৫ জুন ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের শীর্ষ বৈঠক হয়। এতে পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি বিশেষভাবে মারকেলের দিকে ছিল। অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনেও মারকেল থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তিনি তখন জার্মান সরকার তত্ত্বাবধায়কের প্রধান হিসেবেই অংশ নেবেন। সেদিক থেকে জুনের সম্মেলনটি ছিল চ্যান্সেলর হিসেবে মারকেলের শেষ শীর্ষ বৈঠক। কোভিড-১৯, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, অভিবাসন এবং রাশিয়া, তুরস্কসহ বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বৈঠকের আলোচ্যসূচি। মহামারি ও টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে ইইউর দেশগুলো এখন নিজেদের সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করছে। এছাড়া এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইইউ দেশগুলোর মধ্যে অবাধ চলাচল বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
মারকেল বরাবরই ছিলেন মধ্যস্থতাকারী বা সমম্বয়কারির ভূমিকায়। ইইউ মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার একটি ক্লাব। নিছক কূটনৈতিক নিয়ম রক্ষাই এর মুখ্য বিষয় নয়, ২৭ জাতি জোটের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মুক্ত আলোচনা এর উল্লেখযোগ্য প্রতিপাদ্য। তাই বিভিন্ন ইস্যুতে নেতৃবৃন্দ বিতর্ক করেন। পরিস্থিতি যেন বেশি উত্তপ্ত হয়ে না ওঠে, সে জন্য মারকেল সময় সময় সক্রিয় হতেন। পরবর্তী সময়ে তার শূন্যস্থান পূরণে কাউকে পেতে সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। এবারের বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটি এবং হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান বিতর্কে জড়ালে মারকেল পরিস্থিতি শান্ত করেন।
মারকেলের উত্তরসূরি হওয়ার জন্য ঐ বৈঠকে রুটি ও ওরবানের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই আঁঁচ করা গেছে। মারকেলের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা ইউরোপীয় নেতাদের কথা বলতে গেলে এ দুজনের নামই আসবে। তারা উভয়েই ২০১০ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। এবারের ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের সম্মেলনে এলজিবিটি ও অন্যান্য অধিকার ইস্যুতে রুটি ও ওরবানের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়। বাদানুবাদের একপর্যায়ে রুটি বলেন, মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ইইউর মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে একমত না হলে হাঙ্গেরির উচিত জোট ছেড়ে দেওয়া। উল্লেখ্য, রুটি একজন সামাজিক প্রগতিশীল উদারপন্থি; অন্যদিকে ওরবান একজন স্বঘোষিত রক্ষণশীল খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রের ধারক। ইইউর কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এবারের বৈঠকটি কার্যত ছিল এক ‘অন্তর্বর্তী শীর্ষ সম্মেলন’। এতে মারকেল উপস্থিত ছিলেন বটে, কিন্তু আগের মতো তাকে অতটা সক্রিয় মনে হয়নি। অনেকেই তাকে মুক্ত বিশ্বের নেতা বিবেচনা করে থাকেন। বিশেষ করে ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়া এবং ব্রিটেনের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার ঐ ভূমিকা আরো জোরালো হয়।
মারকেলের স্থান পূরণ রুটি ও ওরবান ছাড়া ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে অন্য কাউকে তেমন দেখাও যাচ্ছে না। কারণ ইউরোপের দেশগুলোতে সাধারণত কাউকে এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে দেখা যায় না। মারকেলের পূর্বসূরি গেরহার্ড শোর্ডার সাত বছর চ্যান্সেলর ছিলেন। বিশ্বের অন্যান্য অংশের মতো ইউরোপেও যখন করোনার বিস্তার ঘটছে, তখন রুটি ও ওরবান পারস্পরিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। অথচ এখন বাজেট ঘাটতি, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও ইউরোপীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়া উচিত ছিল। পরিস্থিতি এত দূর গড়ায় যে, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওরবান বলেন, ‘আমি জানি না, ডাচ প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঘৃণা করেন কেন।’ ইইউর বিভিন্ন পলিসির সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মতভেদ লক্ষণীয়।
২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর মারকেল এতকাল ইইউতে একটি স্থিতিশীলতার উত্স হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু এখন তার সেই ভূমিকা ক্রমেই ক্ষয়ে এসেছে। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো এরকম একটা সময়ের অপেক্ষায়ই ছিল। তারা এখন খোলাখুলিভাবে অনেক পলিসির বিরোধিতা করছে। এছাড়া জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অ-ইউরোপেরও মুক্ত বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু মারকেল যে ঐক্যের স্তম্ভের মতো ভূমিকা রেখে গেছেন, সেটি অনাগত সময়ের জন্য তাকে স্মরণীয় করে রাখবে।
