কোভিডের মৌসুমে ‘জি৭’-এর সামিট বেশ রোমাঞ্চকর ঘটনা ছিল কিন্তু! সাতটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা কোভিডকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে দিব্যি ‘কর্নওয়ালে’ সরাসরি আলোচনায় বসলেন! এমনকি যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ—ছেলে, নাতি ও তাদের পরিবারসমেত ‘এডেন প্রজেক্টে’ জি৭-এর অতিথিদের ডিনার খাওয়ালেন; মুখোশবিহীন আতিথ্যকর্তা রানি ও অতিথিরা এডেনের এখানে-সেখানে ঘুরলেন, কেউ কেউ-বা রানিকে ধন্যবাদ জানালেন। ১৯৭৫ সালে ‘জি৭’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রথমবার, ২০২১ সালে রানির সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপ নেই; রানিরও ভিন্ন মেজাজের পরিবেশে ভালো লেগেছে নিশ্চয়! অনেক ছবিও তোলা হলো; ফ্যামিলি ছবিও তোলা হলো, সামাজিক দূরত্বকে মান্য করে। খাস জি৭-এর সদস্যদের নিয়েও ফ্যামিলি ছবি তোলা হয়। সদ্য তোলা এইসব ছবিতে ‘গ্রেট অ্যান্ড গুড’ রাজনৈতিক নেতাদের দেখে, তাদের সম্বন্ধে যার যেমন ইচ্ছা ভেবে নিন! বাস্তবতা বলছে যে প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন বিশ্ব জনসমষ্টির বিশাল অংশ এখনো টিকা পায়নি। কোভিড-টিকা নেই কি? আছে, মজুতদারের গুদামজাত; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ যে পরিমাণ টিকা মজুত করেছে তা দিয়ে যার যার তার তার অঞ্চলের জনসমষ্টিকে কয়েক বার করে টিকা দেওয়া যাবে। টিকার আকাল চলছে।
সামিটের পথে রওনা হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ৫০০ মিলিয়ন টিকার ডোজ দানের ঘোষণা করেন। এই দান-অনুদান কীভাবে কার্যকরী হয়, দেখা যাক। অবশ্য প্রায় দেড় মিলিয়ন জনসমষ্টির দেশ ‘ত্রিনিদাদ ও টোবাগো’কে যুক্তরাষ্ট্র ছয় ডোজের ৮০টি টিকার শিশি পাঠিয়েছে (৪৮০টি টিকা)। এবং অতিথি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সামিটে যোগদানের আগে নয়াদিল্লির বৈদেশিক মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর টিকার সন্ধানে ওয়াশিংটনে চার দিনের সফরে গিয়েছিলেন। বিল গেটস বিশ্বব্যাপী প্রচারিত এক ইন্টারভিউতে যখন বললেন বিশ্বের প্রতিজনের জন্য টিকা হবে—শুনে, যথাক্রমে বিসাস ও ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ‘ভিডিএল’ ওরফে ফন ডের লিয়েন প্রতিজনের জন্য টিকা হবে বলে কবুল করে বসলেন! জি৭ সামিটে ‘গ্রেট অ্যান্ড গুড’ লিডাররা ‘ডিপ্লোরেবল’দের জন্য ১ বিলিয়ন এক্সপেরিমেন্টাল টিকা বানানো ও দান-খয়রাতের প্ল্যান তৈরি করেছেন। প্ল্যানের বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ইতিপূর্বে স্বাধীনভাবে ‘কোয়াডে’র চার দেশও (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত) ২ বিলিয়ন টিকার ডোজ তৈরি ও বিতরণের কথা শুনিয়েছিল কিন্তু! ‘ডিপ্লোরেবল’ অধ্যুষিত অনেক দেশেরই টিকা, ওষুধ তৈরির ইনফ্রাস্ট্রাকচার রয়েছে বটে কিন্তু সমস্যা হলো যে মহাপবিত্র বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির (আইপি) অধিকার নন-নিগোশিয়েবল আইটেম এবং টিকা, ওষুধের কাঁচামালের বেচাবেচির অর্থ হলো জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিকে প্রশ্রয় দেওয়া, কাজেই প্রশ্নাতীত সামগ্রী। কাজেই গণহারে টিকা তৈরিও অবান্তর প্রশ্ন! ‘জি৭’-এর শিল্পায়িত-গণতন্ত্রের বড় অসহায়ত্ব হলো যে ‘সাংঘাতিক ক্ষতিকর’ রাশিয়া ও চীন তাদের ‘ওথরিটেরিয়ান’ হুমকির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে তছনছ করতে একযোগে মাঠে নেমেছে।
এ পর্যন্ত, অন্য দেশের টিকা পাওয়ার ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে চীন ও রাশিয়া; কিন্তু পশ্চিমা জগতের প্রতিপক্ষদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য মিশ্রিত অভিযোগ হলো যে হতাশাগ্রস্ত এই দুই দেশ ‘টিকা-কূটনীতি’তে নেমেছে। হয়তো তাই বহুল ব্যবহূত কিছু কিছু সামজিক নেটওয়ার্ক ‘স্পুিনক-ভি’ এবং সিনোফার্মের টিকার প্রবেশাধিকার মঞ্জুর করেনি। একইভাবে, কিউবার ইক্সপেরিমেন্টাল টিকা ‘সবেরানা’ (Soberana) বা ট্রাম্পের ‘নারকো সন্ত্রাসে’র দেশ ভেনিজুয়েলার কোভিড-১৯ মেডিকেশন ‘কারভাটিভির’ (carvativir) ও সামজিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার পায়নি। কারণ, ২০২১-এর ‘জি৭’ সামিট খুব গুরুত্বপূর্ণ; কোভিড টিকা থেকে শুরু করে সবকিছু ‘ডেমোক্রেটাইজড’ হবে।
‘জি৭’-এর জন্মকাহিনি এরকম :১৯৭৩ সালে পশ্চিমা অর্থনীতির জগতে ‘তেল শক/সংকট’ এবং ব্রেটন উডস সিস্টেমের ধস নামক দুটো বড়ো মাপের ঘটনা ঘটে। অতঃপর, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ভালেরি জিসকার্ড (ডি’এস্টা) ও পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর হেলমুট শ্মিট বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৫ সালে ‘জি৭’-এর জন্ম হয়, ফ্রান্সে প্রথম সামিট অনুষ্ঠিত হয়।
আশির দশক থেকে ‘জি৭’-এর তালিকায় বিশ্বীয় বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতিসংক্রান্ত প্রশ্নাবলি ক্রমান্বয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১ সালে ‘জি৭’ লন্ডন সামিটে মিখায়েল গর্বাচেভ আমন্ত্রিত অতিথি হন। কয়েক মাসের ব্যবধানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি পর্বের সূচনা হয়। ১৯৯৮ সালে, অপ্রত্যাশিতভাবে ‘জি৭’ থেকে ‘জি৮’ আবির্ভূত হয়; যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বীয় হেজিমনির সহযোগী হিসেবে বরিস ইয়েলিসনের রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইয়েলিসনের উত্তরাধিকারী ভ্লাদিমির পুতিন যখন অধিকতর নির্ভরতামুক্ত স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক প্রক্রিয়ার রেখাচিত্র নেওয়া শুরু করেন, রাশিয়া ক্রমশ আমেরিকানদের ও তাদের পশ্চিমা সঙ্গীদের সুনজর হারাতে থাকে। ২০১৪ সালে পশ্চিমা শক্তির অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের দরুন উদ্ভূত ইউক্রেন সংকটকে (আমার ‘একমেরু বনাম বহুমেরু’ গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা দেখুন) অজুহাত করে রাশিয়াকে ইক্সক্লুসিভ ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়, এবং ‘জি৮’ আবার ‘জি৭’ হয়। মস্কো কোনো পাত্তা দেয়নি।
অর্থাত্ পশ্চিমের সাতটি দেশকে নিয়ে গঠিত ‘জি৭’ তীব্রভাবে রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমে পরিণত হয় এবং ‘ইকসসেপশনালিজম’ নামক রাজনৈতিক ‘প্যারাডাইম’ প্রবর্তিত হয়।
সত্তরের দশকে উন্নত দেশগুলোর তথা গ্লোবাল নর্থের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উত্পাদনের আউটপুট ছিল দুই-তৃতীয়াংশ, উন্নয়নশীল ও অধিকতর উন্নয়নশীল দেশসমূহের তথা গ্লোবাল সাউথের আউটপুট ছিল এক-তৃতীয়াংশ। নাটকীয়ভাবে, এই ভূমিকা উলটে গেছে; বৈশ্বিকভাবে গ্লোবাল সাউথ উত্পাদন করে দুই-তৃতীয়াংশ, গ্লোবাল নর্থের হিস্যা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’কে ভিত্তি করে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক ধস পশ্চিমা জগতের অসহায়ত্বকে নিমর্মভাবে উন্মোচিত করে দেয়। সে সময়ে অধিকতর প্রতিনিধিত্বমূলক ‘জি২০’ জন্ম নেয়। যেখানে রাশিয়া ও চীন রয়েছে; এবং ইইউসহ ‘জি৭’-এর ছয়টি দেশ অন্তর্ভুক্ত।
সত্যি বটে যে, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন পশ্চিমের কৃতিত্ব। এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত বিশ্বব্যাপী উপনিবেশের পত্তন; অর্থাত্ পত্তনকারীর অঢেল অর্থনৈতিক প্রাচুর্য অর্জনের লোভ। (কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণ :লবণ আন্দোলন, নীল চাষ, উত্তর ভারতে আফিমের আবাদ এবং উত্পাদিত পণ্যের চীনে বাজারজাত করা, ইত্যাদি)। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সিস্টেম সৃষ্টি করে পশ্চিম, সঙ্গে জুড়ে দেয় আইডিওলজির ট্যাগ।
পশ্চিমের বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া অন্তর্নিহিতভাবেই মাত্র এক আইডিয়োলজির সঙ্গে সংযুক্ত এবং ‘লিবেরালাইজেশন’ হলো সেটির মোটর বা ইঞ্জিন। শি জিংপিংও গ্লোবালিস্ট; কিন্তু চীন পশ্চিমের আইডিওলজি গ্রহণ করে পশ্চিমা ভিশনে রূপান্তরিত হয় না, এমনকি ওবামার বৈদেশিক মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের—এসো, আমরা যার যার প্রভাববলয় চিহ্নিত করে নিই প্রস্তাবও শি প্রত্যাখ্যান করেন। চীন ‘কনফুসিয়াসের টিচিং’-এর আবহে ‘সেঞ্চুরি অব হিউমিলিয়েশনে’র অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে, নিজস্ব পথে অগ্রসর হয়; রাজনৈতিক ট্যাগ লাগানো বা বাইরের পৃথিবীতে কমিউনিজমের প্রচারণা করে না; এবং ইকোনমিক সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার অপরিহার্য দৃষ্টান্ত হয় না। তাই, চীনের বিশ্বায়ন—‘ভালো’ থেকে ‘চীনের বিশ্বায়ন খারাপ’ হয়ে যায়।
২০০৮ সালের ধস কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০১৯-২০২০ সালে আসে কোভিড-১৯ মহা-মহামারি। পশ্চিমকে কোভিড১৯ পুরোপুরি বেদিশা অবস্থায় নিয়ে আসে; ফেইস মাস্ক নিয়ে কেলেঙ্কারি ও ‘মূর্ছারোগ’ উদাহরণ। গ্লোবাল সাউথের সাধারণ পাবলিকের চোখেও পশ্চিমের মানসিক, বৈষয়িক দেউলিয়াত্ব ও সহমর্মিতাশূন্য স্বার্থপরতা বিবস্ত্রভাবে ধরা পড়ে। যেমন :‘লোম্বার্ডি’, ‘বেরগামা’য় কিছু মাস্ক পাঠানোর মতো ‘সলিডারিটি’ও নেই।
সার্বিকভাবে, পশ্চিম জ্ঞাত যে একদা যে বৈশ্বিক অর্থনীতি তাদের দৃঢ় মুষ্টির অধীনে ছিল, ছিল তাই বৈশ্বিক অধিরাজ, সেই দিনগুলো আর নেই; তাই ‘জি৭’-কে নতুন ফ্রেমে ফ্রেমবন্দি করে নতুন ন্যারেটিভ তৈরি হয় :‘ওয়েস্ট ইজ বেস্ট’, ‘পুব দিক থেকে আগত শাসানি’কে মোকাবিলা করতে তথা চীনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ক্যাম্পেনে ‘ইচ্ছুকের দল’ (কোয়ালিশন অব দি উইলিং) প্রস্তুত। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের’ বদলা ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ ওরফে ‘বি৩ডব্লিউ’ রেডি!
n লেখক :আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
