রস্ক প্রকল্প। সরকারের একটি আলোকিত প্রকল্পের নাম। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ৮-১৪ বছর বয়সি ৭ লাখ ২০ হাজার ঝরে পড়া শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য ২০১৩ সালে শুরু হয় রস্ক ফেজ-২ প্রকল্প। তারই সমাপ্তি হলো ৩০ জুন ২০২১। রস্ক ফেজ-১ যাত্রা শুরু করেছিল ২০০৫ সালে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ বছরের রস্ক পরিবারের পরিসমাপ্তি হলো। একদিকে সফল সমাপ্তির আনন্দ, আরেক দিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হতাশা আর অজানা আশঙ্কার কষ্ট।
২০২০ সালে মার্চে যোগদানের পরপরই লকডাউনের শুরু হয় আর সমাপ্তির পরের দিন থেকে আবারও লকডাউন। লকডাউন থেকে লকডাউন কর্মকাল। বলা যায়, বৈশ্বিক মহামারির কালে পরিবেশ প্রতিকূলই ছিল।
রুরাল আনন্দ স্কুলের মাধ্যমে দেশের ৫১টি জেলার ১৪৮টি উপজেলার ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাথমিক চক্র সম্পন্ন হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। রস্ক পল্লি এলাকায় যাত্রা শুরু করলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার কারণে এসডিজির মূল স্লোগান Leave no one Behind (বাদ যাবে না কেউ) টার্গেট করে সম্প্রসারিত করে শহরের বস্তি এলাকায়। ডিপিপি সংশোধন করে এক্সিলারেটেড মডেলে (১ম-৫ম শ্রেণির পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছরে সমাপন) শহরেরের বস্তিবাসী ১০টি সিটি করপোরেশনের ৫০ হাজার শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য আবার কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালে। চার-ছয়টি এলসি (শিক্ষণ কেন্দ্র) একত্র করে ভাড়া নিয়ে গঠন করা হয় কম্পাউন্ড। ২০১৫ সালে ২১টি কম্পাউন্ডের মাধ্যমে শুরু হলেও ২০১৭ সালে মোট ৩৪৬টি কম্পাউন্ডের মাধ্যমে ৪৭ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠচক্র সম্পাদন করে। যেখানে শিশুদের পড়ালেখার পাশপাশি বিনোদন বা খেলাধুলার জন্য একটি কক্ষে করা হয় চাইল্ড ক্লাব এবং নিয়োগ দেওয়া হয় একজন চাইল্ড ফ্যাসিলিট্যাটর (সিসিএফ)। লার্নিং সেন্টারের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকগণ ছিলেন খুবই আন্তরিক। একটা বিষয় লক্ষণীয়, শহরের এসব শিশু পড়ালেখার প্রতি ছিল বেশ আগ্রহী। সেভ দ্য চিলড্রেনের কারিগরি সহযোগিতায় আইএ (এনজিও)-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত কম্পাউন্ডগুলো নিয়মিত মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন প্রোগ্রাম সুপারভাইজার (১০ সিটি করপোরেশনে ১০ জন)। শিক্ষকগণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, এনজিওসহ কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বস্তিবাসী ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের সচেতন করাসহ মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষকবৃন্দ তাদের আদরের ছাত্রছাত্রীরা না খেয়ে আছে দেখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এমনকি তাদের নিজেদের বাড়ি থেকেও ত্রাণ নিয়ে বিতরণ করে। গত বছর কোভিড বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালায় সশরীরে উপস্থিতি থেকে শিক্ষকদের কাছে থেকে এসব বর্ণনা শুনে মাঝে মধ্যে অজান্তে চোখ ভিজে যেত। ২০২০ ডিসেম্বরেই ছিল ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার শেষ বছর। এজন্য শিক্ষক শিক্ষিকাগণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ালেখার খোঁজ নেওয়া, ভাতা বিতরণ এমনকি বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা নেওয়া, নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করা যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন; যা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এই বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের ফলে অনেকেই মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হতে পারলেও সংগত কারণেই উচ্চশিক্ষা নিতে পারে না। ফলে বৃহত্ একটা অংশ জেএসসি শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। তারা আর মূলধারায় আর ফিরতে পারে না। বাধ্য হয়ে শ্রম বিক্রি করে বা দৈনিক মজুরির বিনিময়ে জীবন অতিবাহিত করে। তরুণরা দেশের সম্পদ। এই সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য অল্প শিক্ষিত ১৫-২৪ বছর বয়সিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয় পিভিটি (প্রি-ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ) কার্যক্রম। ১ম সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১৫ সালে পাইলট কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৭ থেকে ৯০টি উপজেলায় ২৫ হাজার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুরু হয়। ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, গত এক বছরে শুধু কক্সবাজারেই হোস্ট কমিউনিটি ৯টি উপজেলায় ৮ হাজার ৫০০ জনকে তিন মাস মেয়াদি এই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। পিভিটি প্রশিক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—৫ম শ্রেণি পাশ ও ১৫-২৪ বছর বয়সি তরুণদের এই প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য উপজেলা, এমনকি গ্রামেই যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়ে দক্ষ প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ায় সহজেই মেয়েরা প্রশিক্ষিত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ পেয়েছে। গতানুগতিক ট্রেড সিলেকশন না করে চাহিদাভিত্তিক ট্রেড নির্বাচন করা হয়েছে। যেমন, ট্যুরিজম ও ফটোগ্রাফি, ইলেকট্রিক হাউজ ওয়ারিং ও সোলার সিস্টেম, ড্রাইভিং, মোবাইল সার্ভিসিং, হাউজ কিপিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্যুয়িং মেশিন অপারেটর ও টেইলারিং, ব্লক বাটিক এরকম ২৭টি ট্রেড নির্বাচন করা হয়েছিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর (টিসি), এনজিও (টিপি), কারিগরি সহযোগিতার জন্য সেভ দ্য চিলড্রেন এবং প্রকল্প অফিসের প্রতিনিধি গিয়ে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন ও ট্রেড নির্বাচন করেছে। দেখা গেছে তিন মাসের প্রশিক্ষণের দুই মাস অতিক্রম করতেই পার্টটাইম কাজের সুযোগ পেয়ে তারা আয় করা শুরু করে দিত। জনপ্রতিনিধিগণ এমন প্রশিক্ষণ দেখে খুবই খুশি হয়ে প্রশিক্ষিত তরুণীদের সেলাই মেশিন প্রদান কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এটি একদিকে যেমন বেকার তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করার সুযোগ তৈরি করেছে অপরদিকে নারীর ক্ষমতায়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে শুধু আশ্রয় প্রদান করে মাদার অব হিউম্যানিটিই হিসেবে আখ্যায়িত হননি, তিনি জোর করে বিতাড়িত মিয়ানমার জাতিকে (এফডিএমএন) শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন। যদিও দেশের বেশির ভাগ মানুষ তা অবগত নন। বিশ্বব্যাংকের অনুদানের অর্থে এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেড় লাখ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স (এনটিএফ)-এর গাইডলাইন অনুসরণ করে ইংরেজি ও মিয়ানমারের ভাষায় শিক্ষা প্রদানের এ কাজে ইউনিসেফ সার্বিক সহযোগিতা করেছে। অনুদানের অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের প্রশিক্ষণটিও স্বল্প সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সফলতার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, Information is Power। প্রকল্পের এদিক বিবেচনায় রস্কের রয়েছে একটি শক্তিশালী ডাটাবেজ। এলজিইডি কর্তৃক এমআইইএস সেলের মাধ্যমে সব ছাত্রছাত্রী, প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষকের ব্যক্তিগত তথ্য, অভিভাবকের আয়, সুপারভাইজার বা টিসিদের পরিদর্শন তথ্য, পেমেন্টের জন্য এসিএফের তথ্য হার্ডকপি স্ক্যান করে সেভ করা এবং সরাসরি ডাটা ইনপুটের মাধ্যমে তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। এই ডাটাবেজ ব্যবহার করে বিআইডিএস স্বল্প সময়ের মধ্যে ইমপ্যাক্ট ইভাল্যুয়েশন সম্পন্ন করেছে।
করোনার প্রভাবে আমরা আমাদের অনেক আপনজনকে হারিয়েছি। আর্থিকভাবেও অনেকে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু অর্জন করেছি মানবিক বোধের দীক্ষা। পারস্পারিক সহযোগিতায় কীভাবে একটি বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে প্রায় শতভাগ সফলভাবে শেষ করা যায়, তার প্রমাণ রস্ক দিয়েছে। আবার ফিরে আসুক রস্ক পরিবার একই কিংবা ভিন্ন কোনো আঙ্গিকে—নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী অন্তত সেই স্বপ্ন দেখতেই পারে।
n লেখক :প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব)
