বৈশ্বিক মহামারির ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মৃত্যুর ভয়সহ নানা জটিলতায় জরাজীর্ণ মানবকূল। কেউ আত্মীয়স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর কেউবা মহামারির সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত; আবার আরেক গোষ্ঠী ভাতের জোগান দিতে দিগ্বিদিক হারাতে বসেছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে এই মহামারিকেও হার মানিয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা। একদিকে মহামারির হাহাকার অন্যদিকে নিষ্ঠুরতার আহাজারি। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমানে দিন-রাত্রির এই আসা-যাওয়া আমাদের ছুঁয়ে যায় না। ছুঁয়ে যায় না কোনো স্বস্তির নিশ্বাস।
করোনায় এই সময়ে আমরা দেখেছি হাজার হাজার লাশের মিছিল। দেখেছি মানুষের অসহায়ত্ব এবং হঠাত্ করে পৃথিবীর থমকে যাওয়া। এই করুণ সময়ে প্রকৃতি ছাড় না দিলেও আমরা ভেবেছিলাম মানুষ হয়তো মানুষকে বুঝবে। কিন্তু আমাদের ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে বিগত কয়েক মাসের কিছু নৃশংস ও হূদয়বিদারক ঘটনা। সম্প্রতি মাত্র আড়াই হাজার টাকার বিরোধে খুন হন আজিজুর রহমান। এই ঘটনায় দুই বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে আর্তনাদ ছাড়া কিছুই করার নেই তার স্ত্রী ও স্বজনদের। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন সেই ক্ষোভে স্বামীকে ছয় টুকরা করে রাস্তায় ফেলে গেছেন স্ত্রী। আবার পরকীয়ায় বাধা হওয়ায় স্বামীকে প্রেমিক দ্বারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রী। এতে প্রেমিকার স্বামীকে হত্যা করে পানির টাংকিতে লাশ লুকিয়ে রেখেছেন প্রেমিক এক মসজিদের ইমাম। দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি না দেওয়ায় নেত্রকোনায় নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করেছে স্বামী। কুষ্টিয়ায় পরকীয়ার জেরে এক পুলিশ সদস্যের হাত থেকে তার স্ত্রী তো রক্ষা পানইনি বরং সাত বছরের শিশুসন্তানও বাবার হাত থেকে রক্ষা পাননি। বলা হয়ে থাকে, মায়ের কোল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অথচ নৃশংসতার মাত্রা এতই বেড়েছে যে মা সন্তানকে মেরে নিজেও হচ্ছেন আত্মঘাতী। নিত্যনতুন এরকম অহরহ আঁেক ওঠার মতো ঘটনা ঘটছে যা মানুষের মানবিক অস্তিত্বকে বিলীন করে দিচ্ছে।
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে যে আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা অন্য কোনো প্রাণীতে নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে হিংস্রতা কেন বেড়েই চলেছে? মানুষের মধ্যে দিন দিন মহানুভবতা ও সহানুভূতিশীলতা লোপ পাচ্ছে। রাস্তাঘাটে খেয়াল করলেই দেখা যায় সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ নিচু শ্রেণির প্রতি কতটা আক্রমণাত্মক। করোনাকালে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট হওয়ার কারণে অতীতের চেয়ে এখন তুলনামূলক বেশি মানুষের মধ্যে সহিংস আচরণের প্রকাশ ঘটছে। এতে করে পারিবারিক সমস্যাগুলো জটিল হয়ে নৃশংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিগত তিন মাসে ১৪টি ঘটনায় ২২ খুনের বিশ্লেষণে দেখা যায় নৃশংসতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। পারিবারিক সহিংসতার এই ১৪ ঘটনায় খুন হওয়া ২২ জনের মধ্যে চারটি শিশু এবং দুজন কিশোর।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ এখন তার রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করেই তার তাত্ক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ করছে। অপরাধীদের হত্যাকাণ্ডেও এসেছে নানা পৈশাচিক ধরন। এমনকি মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোও দিনকে দিন মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে পরিবারকেও পরোক্ষভাবে দায়ী করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কারণ, একজন মানুষের আচরণের ক্ষেত্রগুলো অনেকাংশেই পরিবার নির্ধারণ করে দেয়। মানুষের এমন নৃশংস আচরণের আরেকটি অন্যতম কারণ ব্যক্তিত্বের বিকার বা মাদকের প্রভাব। মাদক মানুষকে হিংস্র করে তোলে। ফলে তার মধ্যে নৃশংসতার মাত্রা এতটাই প্রবল হয় যে আত্মঘাতী থেকে শুরু করে যে কোনো বিকৃত কাজ করতে সে দ্বিধাবোধ করে না।
এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ মানবিক অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাবে। তাই সময় থাকতে এখনই এর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুদেরকে ছোট থেকেই নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে যে কোনো উপায়ে সবাইকে বের হয়ে আসতে হবে। মাদকের কবলে পড়ে যাতে একটি জীবনও নষ্ট না হয়, সেজন্য মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সর্বোপরি মানুষকে জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে জানতে হবে। একটি মহামারি সবকিছু নিশ্চুপ করে দিয়েছে। এই মহামারি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না। জীবন মানেই মাত্র কিছু বছর এবং সেই সঙ্গে কারো পাওয়া কারো না পাওয়া। এই পাওয়া না পাওয়ার মাঝেই আমাদের জীবনযুদ্ধ। তাই জীবনের জন্য যুদ্ধটা হওয়া উচিত জীবনকেই কেন্দ্র করে। আসুন আমরা নিজেকে ভালোবাসি এবং আমাদের চারপাশের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
