‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহিদ স্মরণে’—কালজয়ী এই গানের রচয়িতা ফজল-এ-খোদা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। ঘাতক ভাইরাস করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন ৪ জুলাই ২০২১-এর ভোরবেলা। তার রচিত গান শুধু নয়, তিনি বেঁচে থাকবেন অন্যান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যেও। অসংখ্য গান, যেমন—দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান, ইসলামি গান, লোকগীতি, চলচ্চিত্রের গান ইত্যাদি ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রভৃতি। তবে ফজল-এ-খোদা গীতিকবি হিসেবেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছেন। তার লেখা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের মধ্যে ১২তম স্থান অধিকার করেছে। এটা তার জীবনের পরম প্রাপ্তি বলে মনে করি। যতদূর জানি, উল্লিখিত গানটি তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় ১৯৬৯ সালে লিখেছিলেন। প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার গানটিতে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই গানটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিকামী বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিল। এখনো এই গানটি মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহিদ দিবসসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গীত হয় এবং এর মূর্ছনা এখনো বাঙালি জাতিকে আন্দোলিত করে।
এখানে ফজল-এ-খোদার আর একটি জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানের কথা উল্লেখ করতে পারি, ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’। প্রতিটি বাঙালিকে এই গানটি দেশপ্রেমে অধিক উদ্বুদ্ধ করেছে সন্দেহ নেই। দেশের গান হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে গানটি। আজও এই গানের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। ফজল-এ-খোদার লেখা জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে—ভালোবাসার মূল্য কত, ভাবনা আমার আহত পাখির মতো পথের ধুলোয় লুটোবে, বাসন্তী রং শাড়ি পরে কোন রমণী চলে যায়, কলসি কাঁখে ঘাটে যায় কোন রূপসী, আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগে, প্রেমের এক নাম জীবন, বউ কথা কও পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে রে, খোকনমণি রাগ করে না, হূদয়ে এক পাথর আছে লাগলে আঘাত আগুন জ্বলে, ফুল আমি ভালোবাসি তুমিও বাসো, মরমি! যাই শরমে মরিয়া প্রভৃতি।
ফজল-এ-খোদার লেখা গানে স্বনামধন্য সুরকার ও সংগীত পরিচালকেরা সুর করেছেন। তাদের মধ্যে আজাদ রহমান, আবদুল আহাদ, ধীর আলী মিয়া, বশির আহমদ, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, শেখ লুত্ফর রহমান, কাদের জামেরী, সমর দাস, সুবল দাস, সত্য সাহা, আবেদ হোসেন খান, অজিত রায় উল্লেখযোগ্য। কণ্ঠ দিয়েছেন আজাদ রহমান, বশির আহমদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, মাহমুদুন্নবী, মোহম্মদ আবদুল জব্বারসহ প্রখ্যাত অনেক শিল্পী। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফজল-এ-খোদার গানের সংকলন ‘গান’ শিরোনামে। তার অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—কবিতা :সূর্য স্বপ্ন দ্বীপ, বিতর্কিত জ্যোত্স্না, নামে যার কেঁপে ওঠে, তাড়া করে অশুভ সময়, নির্জন পঙিক্তমেলা, প্রভৃতি; গান: সঙ্গীতা, ইসলামি গান, মন্দিরা, বন্দেগি, কাজল মাটির গান, প্রভৃতি; শিশুসাহিত্য :সানাই, ফুলপাখিদের গান, যমযম, আড়ি, টুনটুনি, রবীন্দ্র নজরুল বঙ্গবন্ধু জয়নুল, নাটক নাটক, জয় মুক্তিযুদ্ধ, জাগল বাঙালি জাগল, নটে গাছটি মুড়লো, রয়েল বেঙ্গল, জয় ছড়ায় জয়, আড়ং, প্রভৃতি; প্রবন্ধ :প্রাসঙ্গিকী, সংগীতভাবনা প্রভৃতি।
ফজল-এ-খোদা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বেতারে চাকরিকালীন তিনি বেতার বাংলা, বাংলাদেশ বেতার ও শাপলা শালুক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। শাপলা শালুক নামে পরবর্তীকালে একটি শিশু সংগঠন গড়ে তোলেন এবং প্রায় সারা দেশে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের পথ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কীর্তিমান এই ব্যক্তিকে নিয়ে শিশুকিশোর সংগঠন আনন ফাউন্ডেশন তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে ২০১৪ সালে জন্মোত্সব উদ্যাপন করে। এই সংবধর্না অনুষ্ঠানে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। রাষ্ট্র আমাকে নিয়ে যা করতে পারেনি, আনন ফাউন্ডেশন সেটা করল।’ তার এই আক্ষেপটি আমাদের মনেও রেখাপাত করেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আশরাফুল আলম, কবি নাসির আহমেদসহ সবাই একই মত ব্যক্ত করেন। কবি ফজল-এ-খোদা তার কর্মের মূল্যায়ন যথাযথভাবে পাননি। তবে বাংলাদেশের মানুষ তাকে মনে রাখবে তার কর্মের জন্যই।
ফজল-এ-খোদা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালের ৯ মার্চ, নানাবাড়ি পাবনা জেলার বেড়া থানার বনগ্রামে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার রতনকান্দি গ্রামের দক্ষিণপাড়ায়। ১৯৬২ সালে ঢাকার বাঙ্লা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। তার আগেই তিনি অবশ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে অ্যাডাল্ট এডুকেশন অফিসার হিসাবে ভিলেজ এইডে চাকরি শুরু করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তত্কালীন রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম জার্নাল পাক্ষিক এলান পত্রিকার সহসম্পাদক পদে যোগদান করেন। কবি ফজল-এ-খোদার মৃত্যুতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি প্রচার-প্রসারের আড়ালে থাকা একজন প্রচারবিমুখ বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ ছিলেন। আমরা তার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান। জীবদ্দশায় আমরা তাকে কিছুই দিতে পারিনি। আজ তার স্মৃতির উদ্দেশে শুধু তার কথাটাই তাকে বলতে পারি—সালাম সালাম হাজার সালাম...।
n লেখক :গীতিকবি, শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসংগঠক
