বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২১, ২১:৩৭

১১ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা

রেজাউল হক কৌশিক

করোনাকালীন বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। অবশ্য এ সময়ে যেহারে ঘাটতি বাড়বে বলে আশঙ্কা ছিল তেমন ঘটেনি। করোনার শুরুতে রপ্তানি যেমন কমে গিয়েছিল অন্যদিকে আমদানিও ব্যাপকহারে কমে গিয়েছিল। তাতে কমে এসেছিল বাণিজ্য ঘাটতি। সম্প্রতি আবার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। বিদায়ী অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম ১১ মাস জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কম হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, করোনার কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ ছিল। আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্ট খাতে রপ্তানি কমেছে। গার্মেন্ট পণ্যে মূল বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার প্রকোপ বেশি ছিল। অন্যদিকে করোনার কারণে আমদানি বাণিজ্য যে স্থবির হয়ে পড়েছিল তাতেও এখন গতি এসেছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে।

বাণিজ্য ঘাটতি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণেই আবার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। করোনার কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা অনেক কমে গেছে। করোনার সময়ে আমদানি ব্যয় কমলেও আবার বাড়তে শুরু করেছে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি আগামীতে আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে দেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ডলার, এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৫ হাজার  ৪২৩ কোটি ডলার। সে হিসেবে ১১ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ঘাটতির এ পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)।

এ সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি আয় করেছে, বিপরীতে পণ্য আমদানি ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি চাহিদাও বেড়েছে। তাই আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তবে দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি কম হয়েছে। প্রথম ১১ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।

বিমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। করোনাকালীন মানুষ ভ্রমণ কম করেছে। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি কম হওয়ায় বিমার খরচও কমে গেছে। ফলে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে এ খাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩০ কোটি ডলার। গত অর্থবছর একই সময়ে তা ছিল ২৩৪ কোটি ডলার। ঘাটতি কমেছে ৪ কোটি ডলার।

বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকায় দেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি আগের মাসের তুলনায় বেশ কিছুটা বেড়েছে। তবে আগের অর্থবছরের একই সময় চলতি হিসাবে ঘাটতি আরো বেশি ছিল। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে চলতি হিসাবে ১৮৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতিতে পড়ে দেশ। গত এপ্রিলে এই ঘাটতি ছিল ৯৭ কোটি ডলার। তবে এর আগের অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৪৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।

চলতি হিসাবে বিদেশ থেকে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আসে এবং সেখান থেকে বিদেশে চলে যাওয়া অংশটুকু বাদ দিয়ে ব্যালান্স হিসাব করা হয়। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্স, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসহ (এফডিআই) অন্যান্য উেসর লেনদেন হিসাব নিকাশ করে সার্বিক হিসাব প্রস্তুত করা হয়। গত মে মাস পর্যন্ত সার্বিক হিসাবে বাংলাদেশের ব্যালান্স ছিল ৮৫১ কোটি ডলার। গত বছরের মে মাসে এ ব্যালান্স ছিল ১৩৯ কোটি ডলার।

মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব সরাসরি পড়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপরও। এফডিআই কমেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সরাসরি মোট যে বিদেশি বিনিয়োগ আসে তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে নিট এফডিআই বলা হয়।

উল্লেখ্য, রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যেটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। আর চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।