যুগে যুগে ভাষার বিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে বাংলা ভাষায় ‘চাঁদ’ কখনো ছিল ‘চন্দ্র’, কখনো ছিল ‘চন্দর’। ভাষার এই বিবর্তনে কিন্তু অর্থ অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনটি শব্দ দিয়েই কিন্তু পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহকে নির্দেশ করা হয়েছে। অন্যদিকে আদিকাল থেকে দুই যোগ দুই সমান চার। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি। দুই যোগ দুই পাঁচ অথবা তিন কখনোই হয়নি। অর্থাত্ অঙ্কীয় ভাষার কোনো পরিবর্তন নেই। একেই বলা হয় প্রকৃতির ভাষা। প্রকৃতির আবর্তনকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকাশের জন্য অঙ্কই একমাত্র ভাষা। সুতরাং মানসম্মত গভীর গবেষণার ভাষা হলো অঙ্ক। তাই অঙ্ককে বিজ্ঞানের ভাষাও বলা হয়।
বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখব, যে দেশগুলি অঙ্কে যত উন্নত তাদের শিল্পের অগ্রগতি তত বেশি। শিল্পোন্নত জি-৭ দেশগুলির মধ্যে রয়েছে জাপান, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যু্ক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশগুলির অঙ্কের দক্ষতার বিশ্ব মানদণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাপান রয়েছে ষষ্ঠ অবস্থানে। তাছাড়া কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যথাক্রমে ১২তম, ২৫তম, ২০তম, ৩১তম, ১৮তম ও ৩৭তম। বিশ্বের শিল্পপ্রধান দেশগুলির অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছে পরিশ্রম, মেধা ও অঙ্কের পারদর্শিতার ওপর নির্ভর করে। হাল আমলে বিশ্বের সকল দেশই চীনের শিল্পোত্থানে অবাক। দক্ষিণ কোরিয়া শিল্পে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। আমরা সবাই অবাক হচ্ছি, কেন এই দেশগুলো এত দ্রুত বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর নেপথ্যের বৈজ্ঞানিক কারণ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি দেখব, প্রকৃতির ভাষা জানার পারদর্শিতায় দেশগুলো অগ্রগামী। অঙ্কের পারদর্শিতার দৌড়ে চীন এখন পৃথিবীতে প্রথম। দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থানও জাপানের পরেই অর্থাত্ সপ্তম। শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নির্ভরশীল শিল্পকারখানার গবেষণা শাখার দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সক্ষমতার ওপর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তন ঘটে। সেই রুচিবোধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিল্পপণ্যের উন্নয়নসাধনের জন্য গাণিতিক মডেল দরকার, যা গবেষণা শাখার নিরন্তর পরিশ্রমের ফসল। এই গাণিতিক মডেল তৈরিতে দরকার প্রকৃতির ভাষা তথা অঙ্কে পারদর্শী দক্ষ জনবল।
বর্তমান পৃথিবী জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির ওপরে দণ্ডায়মান। যাকে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলছি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাণিজ্যে আমেরিকা এগিয়ে থাকলেও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষ জনবল বা প্রোগ্রামার কিন্তু চীন, রাশিয়া, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশ থেকে নিয়োগ হচ্ছে। পৃথিবীর দক্ষ প্রোগ্রামারদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ৪৫ শতাংশে প্রোগ্রামারের স্নাতক ডিগ্রি গণিত বিষয়ের ওপর। এখানে গণিত ও প্রোগ্রামিংয়ের নিবিড় সম্পর্ক বের করতে আমরা প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ প্রথম এক থেকে ১০টি জাতির তালিকা নিলাম। দেশগুলো হলো চীন, রাশিয়া, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জাপান, তাইওয়ান, ফ্রান্স, চেক-রিপাবলিক ও ইতালি। গণিতের বিশ্বদক্ষতার মানদণ্ডে প্রত্যেকটি দেশই কিন্তু এক থেকে ৩০-এর মধ্যে রয়েছে। এখান থেকে অঙ্ক ও প্রোগ্রামিংয়ের মধ্যে চমত্কার একটি যোগসূত্র পাওয়া যায়। অঙ্কে যে জাতি যত ভালো তারা প্রোগ্রামিংয়ে তত ভালো। প্রোগ্রামিংয়ে পারদর্শী জাতি গড়ার ক্ষেত্রে স্কুল ও কলেজে অঙ্কের জ্ঞানকে যারপরনাই শানিত করতে হবে। অঙ্কের জ্ঞানকে শানিত করার লক্ষ্যে অনুসরণ করতে হবে সেই সব দেশকে, যারা প্রোগ্রামিংয়ে বিশ্ব র্যাকিংয়ে সেরা। এক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। কারণ, পৃথিবীতে প্রোগ্রামিং দক্ষতায় এই দেশ দুটি প্রথম ও দ্বিতীয়। যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৮তম। শুধু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নয়, যে কোনো ক্ষেত্রে মানসম্মত গবেষণা করতে হলে অঙ্ক বিষয়ে গভীর জ্ঞানের বিকল্প নেই। একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরলাম। পাবলিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, যিনি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি তার গবেষণাকালীন ল্যাবের একটি প্রোগ্রামের অঙ্কীয় সমাধান করতে পারছিলেন না। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ছাত্রের কাছেই এই সমাধানটি করার জন্য তিনি সাহায্য চান। সর্বশেষে ঐ গবেষণা ল্যাবের এক চায়নিজ ছাত্র তার সমস্যাটির অঙ্কীয় সমাধান মুহূর্তের মধ্যে করে দেন। সমাধানটি করতে তিনি কাগজও ব্যবহার করেননি। হাতের তালুতেই কলমের মাধ্যমে লিখে সমাধানটি করে দেন। এখান থেকেই চায়নিজদের অঙ্কের পারদর্শিতা উপলব্ধিযোগ্য। আমেরিকানরা বর্তমান সময়ে উন্নত জাতি হলেও অঙ্কের ক্ষেত্রে চায়না ও রাশিয়াকে অনুসরণ করতে একটুও কার্পণ্য করছে না। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকায় চালু হয়েছে স্টুডিও অব এনগেজিং ম্যাথ, রাশিয়ান স্কুল অব ম্যাথমেটিকস ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্কুলপড়ুয়া আমেরিকান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীষণ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা পিছিয়ে থাকব কেন? গণিতের উত্কর্ষসাধনের নিমিত্তে আমাদেরও কালক্ষেণ না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্রষ্টা ও প্রকৃতির ভাষা হলো অঙ্ক। এই ভাষাকে অনুধাবন করেই উন্মোচন করতে হবে প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির রহস্য। তবেই ঘটবে গবেষণা ও মানবসম্পদের প্রকৃত উন্নয়ন।
আয়তনে ছোট্ট আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। মাথাপিছু আমাদের জমির পরিমাণ মাত্র ০.৬৫ বিঘা। তাই শিক্ষা ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতিই আমাদের একমাত্র ভরসা। বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নসাধন করতে বদ্ধপরিকর। উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে সরকারের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা, পরিকল্পনা ও উত্সাহ। শিল্পনির্ভর সবকিছুর মূলেই কিন্তু রয়েছে প্রকৃতির ভাষা তথা গণিত জানা ও বোঝার দক্ষতা অর্জন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পরিবর্তন করতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা সবাই নামকরা খেলোয়াড়দের নাম বলতে পারি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুল-কলেজে সব ছাত্রই জানে, কারা হাল বছরে গণিতে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে। সামাজিকভাবে তাদেরকে মর্যাদার উচ্চাসনে বসানো হয়। জ্ঞানের কদরের এমন সংস্কৃতি চালু হলে এদেশ গড়ে উঠবেই।
আমি অঙ্ককে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি বলে অন্যান্য বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটরা আমার ওপর মনঃক্ষুণ্ন হবেন না আশা করি। আমার কলেজ-জীবনের এক সহপাঠী এখন পেশায় ডাক্তার। সে বলেছিল, তুমি তোমার কথায় শুধু অঙ্কের কথা বলছো, পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ইত্যাদি সবকিছুরই দরকার আছে। আমি তাকে বলেছিলাম পদার্থ, রসায়ন, প্রাণিবিজ্ঞানে ভৌত উপাদানের যে মিশ্রণ সেখানেও গণিতের জ্ঞান অপরিহার্য। এক্সরে, এমআরআই, সিটি-স্ক্যান ইত্যাদি মেশিনেও রয়েছে গণিতের প্রয়োগ। বাংলা ও সংগীতেও গণিতের ব্যবহার অপরিহার্য। বাংলাকে প্রকাশ করার জন্য রয়েছে ১২টি স্বরবর্ণ এবং ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ। আবার কোনো ভাষা অনুধাবন ও অনুবাদের জন্য যে মডেল রয়েছে সেটাও কিন্তু গাণিতিক মডেল। সুতরাং এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে গণিতের উপস্থিতি নেই। তাই শিল্পোন্নত জাতি বিনির্মাণের নেপথ্যের শক্তি প্রকৃতির ভাষা উপলব্ধি অর্থাত্ গণিত বিষয়ে পারদর্শিতা।
n লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞানও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
