বাংলাদেশ—এ নামটি উচ্চারণের সময় তার আগে এখন জুড়ে দেওয়া হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ; অন্য কথায় আধুনিক বাংলাদেশ। কেন? কারণ, এখন এ দেশটির কান্ডারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানুষের আয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি, নেতৃত্ব দান, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাসহ বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, এমনকি উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন যার নেতৃত্বের কারণে হয়েছে তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব আজ আড় চোখে নয়, অবাক চোখে দেখছে কীভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির সোপানপানে। প্রবাসীরা আজ গর্ব করে বলতে পারে ‘আমি বাংলাদেশি’, শেখ হাসিনা আমাদের নেতা।
দেখুন, বর্তমান বাংলাদেশের বিদ্যুতের সমস্যা প্রায় ৯০ শতাংশ সমাধান হয়েছে, বাংলাদেশ আজ ক্ষুধামুক্ত, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, ওষুধশিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং রপ্তানি করে। আর পোশাকশিল্পে তো বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় রপ্তানিকারক দেশ। সিমেন্ট, রডশিল্প নিজের দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি করে। আসবাবপত্রশিল্পও রপ্তানি করে। হিমায়িত খাদ্য, যেমন—চিংড়ি মাছ, শাকসবজি রপ্তানি করে নিজ দেশের চাহিদা পূরণ করে। যেসব তরুণ সবসময় বিদেশে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ও স্বপ্ন দেখতেন কর্মের জন্য, তারা আজ নিজেরাই নিজের দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জামানত ছাড়া লোন নিয়ে ব্যবসায়ী হচ্ছেন। সরকার বিনা মূল্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, সরকারের বড় বড় আমলা থেকে শুরু করে একেবারে নিম্ন স্তরের সবার বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বড় বড় মেগা প্রকল্প সরকার নিজের অর্থায়নে করছে; ফলে বিদেশি ঋণের বোঝা কমছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে গত ২০ বছরে যে পরিমাণ মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্র আমদানি হয়েছে, তার দ্বিগুণ গত তিন বছরে আমদানি হয়েছে। তার মানে কী দাঁড়াল? তার মানে হলো, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা হরতাল-অবরোধ ভুলতে বসেছে। কারণ, সরকার আমাদেরকে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে আর সেটা শেখ হাসিনার মতো একজন যোগ্য নেতা সরকারপ্রধান বলেই সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণরা এখন আর পিছিয়ে নেই। আইটির কারণে এত বেশি বিপ্লব সাধিত হচ্ছে যে, ঘরে বসেই আয় করছে। বাংলাদেশের মানুষ এত বেশি পরিশ্রমী ও সাহসী যে, গত ১০ বছরে যে পরিমাণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা অকল্পনীয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম বিদ্যুতায়ন হচ্ছে, রাস্তাঘাট হচ্ছে এবং হাজার হাজার গ্রাম ব্যবসার স্থানে পরিণত হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামে শহরের সব সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আমি পৃথিবীর ৩৫টি দেশ ভ্রমণ করেছি; এমনকি কানাডাতে গিয়েও আমি থাকিনি। দেশে ফেরত এসেছি; কারণ একজন ভালো ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও ভালো মাইনের চাকরি করার জন্য যে পরিবেশ দরকার, সেটা বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান। যদিও করোনা বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশকেও খানিকটা ধাক্কা দিয়েছে। আমার মতো একজন উদ্যোক্তা তৈরির পেছনে সরকারের প্রতিদানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কারণ, দেশের মধ্যে ভালো ও বড় কিছু করা যায়—এটা যিনি শিখিয়েছেন এবং সরকারি সব দপ্তর আমার মতো লাখ লাখ যুবককে তৈরি করার জন্য যে ধরনের সাহস, সাপোর্ট দিচ্ছে, তা যিনি দিয়েছেন, তিনি হলেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
ঠিক এই কথাগুলো আমি ইতালির মিলান এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনকে বলেছিলাম। তারা শুনে আমাকে বলেছিলেন, গ্রেট! ওয়েলকাম টু মিলান!
পাঠক, এটা কোনো গল্প না; আমার জীবনের বাস্তব ঘটনা। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমি কেন এটা এখানে বলতে গেলাম? কারণটা সহজ, আপনি যদি অন্যকে সম্মান করতে না পারেন তাহলে অন্যরা আপনাকে সম্মান করবে না। ২০০১ সাল থেকে আমি বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনার, ব্যবসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি যখন ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে দুবাই গিয়েছিলাম ভ্রমণের উদ্দেশ্যে, তখন দুবাই এয়ারপোর্টে ৩০ মিনিট কেঁদেছিলাম। ঘটনাটা বেদনাদায়ক।
আমরা প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এবং বেশ কয়েক জন শ্রমিকসহ ইমিগ্রেশনের জন্য দাঁড়িয়ে আছি প্রায় চার ঘণ্টা; কিন্তু কেউ সামনে যেতে পারছেন না, অর্থাত্ কারো পাসপোর্ট ইমিগ্রেশন অফিসাররা নিচ্ছেন না। কারণ কী? কারণ শুনলে অবাক হবেন। তারা সাদা চামড়ার বা ইউরোপ-আমেরিকার লোকজনকে আগে প্রায়োরিটি দিতে গিয়েই এই গোলমাল। যেমন ধরুন, ৫১তম সিরিয়ালে একজন ইউরোপের নাগরিক দণ্ডায়মান। হিসেবে তিনি তো সবার পরেই পাসপোর্ট জমা দেবেন; কিন্তু না, ইমিগ্রেশন অফিসার হাত দিয়ে ইশারা করেছেন ৫১তম ইউরোপিয়ান ব্যক্তিকে আগে আসার জন্য। ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন এবং যথারীতি পাসপোর্টে সিল নিয়ে বের হয়ে গেলেন। ঐ ভদ্রলোক যেতে যেতে আরেক জন সাদা চামড়ার মানুষ এলেন, তাকেও ইমিগ্রেশন অফিসার ইশারা করলেন এগিয়ে যেতে। আর এভাবেই আমরা যারা বাঙালি, তারা পিছিয়ে পড়তে লাগলাম। একপর্যায়ে আমাদের ভেতর কেউ কেউ বললেন, ‘আমাদেরকেও ডাকেন।’ তখন ইমিগ্রেশন অফিসাররা বকাঝকা শুরু করলেন এবং বললেন, ‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।’
অবশেষে চার ঘণ্টা পরে যখন কোনো সাদা চামড়ার লোক বা ইউরোপের লোক নেই তখন অফিসার আমাদের ডাকলেন এবং রাগের সঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্ন করে সিল মেরে বিদায় করলেন। এদিকে কোম্পানি থেকে ১০ জন বাঙালি শ্রমিককে নিতে এয়ারপোর্টে গাড়ি এসেছিল কিন্তু তাদের বিলম্ব দেখে সেই কোম্পানির গাড়ি চলে গেছে। এবার সেই ১০ জন শ্রমিক ভাই মহাবিপদে পড়ে গেলেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। উপায়ান্তর না দেখে তারা (শ্রমিকরা) হুহু করে কাঁদা শুরু করলেন এবং এই চিত্র দেখে আমারও চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরা শুরু করল। আমি তখন কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে বলেছিলাম, ‘হে আল্লাহ, আমাদের দেশটাকে উন্নত করে দাও, ধনী বানিয়ে দাও, একজন যোগ্য নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি দান করো, যেন আমাদের দেশটাকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে সত্যিকার সোনার বাংলা বানাতে পারে।’ পরে আমি ঐ শ্রমিকদের কোম্পানিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।
আমি এখনো ভ্রমণ করি। এখন আর কেউ মিসকিন বলে উপহাস করার সাহস পায় না। এখন আর চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। এখন ইমিগ্রেশন অফিসারের সঙ্গে জোরের সঙ্গে কথা বলতে পারি। বোঝানোর মতো, বলার মতো অনেক কিছু আছে, যা তারা শুনতে চায় কিন্তু বলার সময় নেই। কারণ, আমাদের আরো অনেক কিছু করে দেখাতে হবে, অনেক দূর যেতে হবে এবং আমরা পারব ইনশাআল্লাহ।
বর্তমান বাংলাদেশে যুবকরা এত বেশি ক্ষমতা রাখে যে, তারা চাইলে দেশটাকে পরিবর্তন করতে পারে। নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
আসুন, আমরা একসঙ্গে, একযোগে দেশটাকে ভালোবাসতে শিখি। এখানে দল-মত চিন্তা না করি। গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হবে। রাজনৈতিক দল তাদের কাজ করবে; কিন্তু আমরা করব আমাদের কাজ। মনে রাখতে হবে, আমার চুলোয় আগুন না জ্বললে কেউ এসে জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে না। আরো মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রত্যেকের ভেতর একটা সুপ্ত প্রতিভা আছে, সেটাকে শুধু নাড়া দিতে হবে, জ্বলে উঠতে হবে, তাহলেই আগামীর সুন্দর ভবিষ্যত্ আমরা নির্মাণ করতে পারব।
n লেখক : গ্রন্থপ্রণেতা, উদ্যোক্তা
