উচ্চশিক্ষার এক ঐতিহ্যবাহী পাদপীঠ

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২১, ২১:৩৬

আজ ৬ জুলাই। ঐতিহ্যের ৬৮ বছর পেরিয়ে আজ ৬৯-এ পদার্পণ করল প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করলেও ধীরে ধীরে বটবৃক্ষের মতো বিস্তার করেছে এর শাখা-প্রশাখা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৯টি অনুষদের অধীনে ৫৭টি বিভাগ ও সাতটি ইনস্টিটিউটের অধীনে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।

মতিহারের সবুজ চত্বরে অবস্থিত ছায়ানিবিড় সুসজ্জিত একটি ক্যাম্পাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আয়তনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাম্পাস। প্যারিস রোডের দুপাশে সারিবদ্ধ গাছগুলো যেন বহু স্বপ্নের সাক্ষী! এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোনায় জড়িয়ে আছে কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষা আর কত কত ঐতিহ্য! দেশের উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে এর প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানে অধ্যয়ন করছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রথম আন্দোলন শুরু হয়। পরিক্রমায় ১৯৫০ সালে রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয় এবং ১৯৫২ সালে প্রথমবারের মতো শহরের ভুবন মোহন পার্কে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আন্দোলনের পর পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য আইনজীবী মাদারবখশের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরীকে প্রথম উপাচার্য করে প্রথম ক্লাস শুরু হয় রাজশাহী কলেজে। ১৯৬১ সালে অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানিটমাসের পরিকল্পনায় মতিহারের সবুজ চত্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্থায়ী ক্যাম্পাস।

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহার প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যুক্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। প্রক্টর হিসেবে শান্তিরক্ষার দায়িত্ব পালনরত ড. জোহা ছাত্রদের মিছিলকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিলেন, চেষ্টা করছিলেন তার প্রাণপ্রিয় ছাত্ররা যাতে পশ্চিমা শাসক চক্রের লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণের শিকার না হয়। কিন্তু ওদের বর্বর আক্রোশ মুহূর্তে ঝাঁজরা করে তার বুক। ড. জোহার মৃত্যুতে সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রতিবাদে টলে উঠেছিল আইউব খানের গদি, পতন হয়েছিল সেই কুখ্যাত স্বৈরশাসকের। তারই ফলে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির পথের একটি ধাপ এগিয়ে যায় মুক্তিকামী বাঙালি। এখনো বাঙালির মনে অধ্যাপক জোহা বেঁচে আছেন শহিদ জোহা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বেই বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহিদ হবিবুর রহমান, শহিদ মীর আবদুল কাইয়ুম, শহিদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার। অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন গণিত বিভাগের শিক্ষক মজিবর রহমান। এ ছাড়া আরো ৩০ জন ছাত্র, কর্মচারী-কর্মকর্তাও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার বিস্তারসহ বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে আসছে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে। ঐতিহ্য ও গৌরবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাই কেবলই উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ নয়, বহু শিক্ষার্থীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণেরও কেন্দ্রস্থল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্যে এর অবদান।

এই দীর্ঘ ৬৮ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন খ্যাতিমান অনেক ব্যক্তিত্ব। এখানে শিক্ষকতা করেছেন জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ভাষাবিজ্ঞানী ড. এনামুল হক, বিজ্ঞানী পিটার বার্টচি, প্রফেসর ড. এম এ বারী, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, প্রফেসর হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর অরুণ কুমার বসাক, প্রফেসর বদরুদ্দিন উমরের মতো বরেণ্য শিক্ষকবৃন্দ।  আবার এখানকার ছাত্ররাজনীতির অনেক দিকপাল এখন দেশে ও বিদেশে সুনামের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন-করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য মেধাবী গ্র্যাজুয়েট এখন দেশ ও বিদেশের মাটিতে নিজের নামের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানকে নিষ্ঠার সঙ্গে আলোকিত করছেন। ২০১৯ সালে বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তিতে সিমাগো-স্কপাসের জরিপে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম অবস্থান দখল করেছিল, যা সত্যিই গৌরবের!

দেশের জনগণের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পশ্চাত্পদতা কাটিয়ে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করার পেছনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। নগরকেন্দ্রিক বিবেচনায় প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেশের দায়িত্বশীল অনেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়কে তেমন মূল্যায়ন করতে চান না। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়, মুখোমুখি হতে হয় চ্যালেঞ্জের। বিগত সময়ে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেওয়া ৬৮ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণ করে আরো সামনে এগিয়ে যাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকগণ তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণে আরো অবদান রাখতে সমর্থ হবে, আলোকিত করবে দেশ ও জাতিকে- রইল সেই প্রত্যাশা। আশা করি দ্রুতই করোনা মহামারী শেষে মতিহারের সবুজ চত্বর আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে, মুখরিত হবে শিক্ষার্থীদের কলরবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়