হাটে না গিয়ে কি কোরবানির গরু কেনা যায়? হাটে গিয়ে দেখেশুনে দরদাম করে গরু কেনার আনন্দই আলাদা—এতদিন বেশির ভাগ মানুষের চিন্তাধারা ছিল এমনটাই। কিন্তু করোনা মহামারির এ সময়ে সেই চিন্তাধারায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ঝুঁকি এড়াতে এখন অনেকেই ছুটছেন খামারে। গরু কিনছেন খামার থেকেই। শুধু তাই নয়, অনেকেই আরো এক ধাপ এগিয়ে গরু কিনছেন অনলাইন থেকেও। সব মিলিয়ে সারা দেশে কঠোর লকডাউনের এ সময়ে খামার ও অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা রীতিমতো জমে উঠেছে। কোরবানির ঈদের এখনো দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও রাজধানীর অনেক খামারেই গতকাল সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে তাদের ৫০ ভাগ গরু বিক্রি হয়ে গেছে।
কিন্তু কেন? শুধু কি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতেই খামার থেকে ক্রেতারা গরু কিনছেন। এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন, তরুণ উদ্যেক্তা মো. রিজওয়ানুর রহমান। বগুড়ার স্বপ্নচারী অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পরিবারের সবাইকে নিয়ে খামারে গিয়ে পছন্দ করে গরু কেনা যায়। যা হাটে সম্ভব নয়। এছাড়া খামারগুলো এখন প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে গরু মোটাতাজা করে। ফলে ভালো মানের গরুর নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার একটা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়। সেসঙ্গে এক জন ক্রেতা ইচ্ছা করলে ওজন করে তার পছন্দের গরু কিনতে পারেন। ফলে তার ঠকে যাওয়ার চিন্তা থাকে না। এসব কারণে মানুষ এখন গরু কিনতে খামারমুখী হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ হাজার গরু বিক্রি হয়ে গেছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
রাজধানীর তুরাগ এলাকার বাসিন্দা আমিনুল বলেন, এখনো কোরবানির গরু কেনা হয়নি। তবে গতবারের মতো এবারও খামার থেকেই গরু কিনব। মিরপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আন্দালিব রহমান বলেন, গত বছর গাবতলীর পশুর হাট থেকে গরু কিনেছিলাম। কিন্তু করোনা বাড়ায় এবার মোহাম্মদপুরের বসিলার একটি খামার থেকে আমি গরু কিনেছি। তিনি বলেন, খামার থেকে গরু কিনলে বড় সুবিধা হলো, খামারেই গরু রেখে লালনপালন করা যায়। তারা ঈদের আগের দিন গরু দিয়ে যায়।
রাজধানীতে কোরবানির গরু বিক্রি করে এমন খামারগুলোর মধ্যে অন্যতম মোহাম্মদপুরের বছিলার ‘মেঘডুবি অ্যাগ্রো’। এই খামারের তারেক মাহমুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, করোনার ঝুঁকি এড়াতে অনেকেই এখন কোরবানির গরু কিনতে খামারমুখী হচ্ছেন। তাদের খামারে এবার প্রায় ১ হাজার গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৫০০ গরু বিক্রি হয়ে গেছে। ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ খামার আছে। এর মধ্যে ঢাকা শহর ও আশপাশেই খামার আছে ৮ হাজারের বেশি। এসব খামারের রয়েছে নিজস্ব ফেসবুক পেজ। খামারের পাশাপাশি তারা তাদের ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফরমের মাধ্যমেও কোরবানির পশু বিক্রি করছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার গরু-মহিষ, ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ছাগল-ভেড়া এবং অন্যান্য ৪ হাজার ৭৬৫টি পশুসহ মোট ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি কোরবানিযোগ্য গবাদি পশু রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই দেশীয় গবাদি পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এবারও চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণে কোরবানিযোগ্য গবাদি পশু রয়েছে। তাই কোনোভাবেই বাইরে থেকে গরু আনতে দেওয়া যাবে না। কোরবানির পশুর নিরাপদ পরিবহন ও করোনা সংকট সামনে রেখে দেশব্যাপী চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
এদিকে, চরাঞ্চলের খামারিরাও কোরবানির পশু বিক্রিতে যুক্ত হলেন অনলাইন প্ল্যাটফরমে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বেইলি রোডের সরকারি বাসভবন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে চরাঞ্চলের গরুর অনলাইন হাটের উদ্বোধন করেন মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।
