প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ।
রোগীর সঙ্গে একজন অ্যাটেন্ড্যান্ট যেতে পারবেন। কোথায় ও কিভাবে যেতে হবে বলার প্রয়োজন পড়ল না। এখানে রোগীর স্রোত অনুসরণ করলেই চলে। লিফটে উঠে করোনা ইউনিটে যখন তারা পৌঁছালো তখন বাজে বিকেল চারটা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। শেষ মাথায় বেশ কয়েকটা বেড খালি। একজন নার্স বললেন, যেটায় পছন্দ হয় শুয়ে পড়ুন।
বেড চয়েস করা যায়, ব্যাপারটা মন্দ নয়। তাও আবার করোনা রোগী। কিন্তু টেনশন বাড়তে লাগল যখন দেখা গেল কোনো ডাক্তারের দেখা নেই। এখন কিছুটা খারাপ লাগছে। তবে অবস্থা খুব বেগতিক নয়।
বেড নং ২২। একজন নার্স সাধারণ বেডে থাকা অ্যাটেন্ড্যান্ট মিথিলার উদ্দেশ্যে বললেন, এই ইউনিটের শেষ মাথায় একজন নতুন রোগী এসেছেন। তার কথা এখানেই শেষ। তিনি হন্তদন্ত হয়ে অন্য একটা বেডের দিকে ছুটলেন যেখানে একজন রোগী ঘনঘন কাশছে। তার কাশির শব্দটা বলছে তার অবস্থা ভালো নয়।
বেড নং ৬৫। মিথিলা মোবাইলে কথা বলতে বলতে হারুনের বেডে এসে পৌঁছালো। হারুন তখন শুয়েছিলেন। তার পাশেই তার স্ত্রীর চোখেমুখে অজানা এক আতঙ্ক। মিথিলা কাউকে যেন শাসাচ্ছেন- তোমার আসতে এতো দেরি হচ্ছে কেন? তারপর মোবাইল বন্ধ করে রোগীর উদ্দেশ্যে বলল, এখন আস্তে কথা বলাই ভালো। পাশের রোগীরা ঘুমাচ্ছেন বা বিশ্রাম নিচ্ছেন।
আয়েশা ভাবলেন, ইনি আবার কেমন নার্স বা ডাক্তার? গায়ে কোনো অ্যাপ্রোন নেই। পিপিই নেই। নার্স বা ডাক্তারের কোনো সরঞ্জামও নেই। শুধু মুখে মাস্ক। হ্যান্ডগ্লাভসও নেই।
এ সময় আরো একজন যুবক এসে দাঁড়াল। তারও খুবই সাধারণ পোশাক। মুখে মাস্ক, হাতে কিছু ওষুধপত্র।
মিথিলা বলল, আম্মুর জন্য ওষুধ এনেছো? সেই যুবক শুধু কয়েকবার মাথা নাড়াল। ওপর-নিচ বরাবর।
ইতিমধ্যে মিথিলা অক্সিজেনের মেশিনটি সেট করে দিয়েছে। হারুন আগের চেয়ে সুস্থবোধ করছেন। তার অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছিল।
মিথিলাই পরিষ্কার করল ব্যাপারটা, ডাক্তার রাতে আসবেন। রাতের খাবারের পর। জরুরি প্রয়োজনে নার্সকে ডাকতে পারেন। তারা পাশেই বসেন। আমরা রাতে আবার দেখা করবো।
আজ তিনদিন হতে চলল। হারুনের অবস্থা উন্নতির দিকে। ওষুধের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ইনজেকশন তাকে দিতে হয়েছে। আরো ইনজেকশন দিতে হবে। এরইমধ্যে তিনি নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলেন। পাশের বেডটি পরের দিনই খালি হয়ে গেল। রোগীর অবস্থার অবনতিতে তাকে দ্রুত আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাম পাশের বেডটিতে এর আগে যিনি ছিলেন তার ছেলে এসে জানালেন, তার বাবাকে আটদিন আইসিইউতে রেখেও বাঁচাতে পারলেন না। এখন গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন লাশ নিয়ে। বিশ দিন ধরে বয়োবৃদ্ধ স্বামীর সেবা-শুশ্রষা করছেন মরিয়ম। আজ খুশি হয়ে বললেন, ডাক্তার আমাদের রিলিজ দিয়েছেন। এ যেন জেলখানা থেকে মুক্তি।
দশদিন পর করোনার রিপোর্টে জানা গেল হারুন নেগেটিভ। তার স্ত্রী শিরিনের রিপোর্টও নেগেটিভ। যেদিন সকালে বিদায় নিবেন, তার আগের রাত্রে মিথিলা ও যুবক স্বপন তাদের বেডে আসলেন। প্রতিদিন রুটিন করে দুইবেলা এসে তারা হারুনের খোঁজখবর নিয়েছে। এক্সরে কোথায় করতে হবে সেখানে নিয়ে গেছে। অতিরিক্ত খাবার কোথা থেকে কিনতে হবে তার হদিশ দিয়েছে। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হলো বিপদের সময়ও সাহস দিয়েছে। করোনার ইউনিট বলে রোগীর সঙ্গে একজন আত্মীয়-স্বজনই থাকতে পারেন। সে হিসেবে এখানে যারা সহযোগিতা করেছে তারাই আপনজন। আত্মীয়ের চেয়ে বড়ো আত্মীয়।
কথা প্রসঙ্গে জানা গেল মিথিলা ও স্বপন এই হাসপাতালে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আছেন। একই জেলার অধিবাসী হলেও ভিন্ন ভিন্ন উপজেলার। হাসপাতালেই তাদের পরিচয়। দুজনই ভিন্ন ভিন্ন কলেজের অনার্স ক্লাসের শিক্ষার্থী। নিজেদের পরিবার থেকে এক এক করে রোগী আসতে থাকায় তারা সেবার সূত্র ধরে এখানে রয়ে গেছেন। তারা অভিজ্ঞ ও পরহিতৈষী। নিজেদের রোগীর পাশাপাশি অন্য রোগীদের টুকিটাকি কাজে সহযোগিতা করছেন। তাদের মাঝে ভালো একটি বোঝাপোড়াও গড়ে ওঠেছে। দুঃখের মাঝেও তাদের নিয়ে কেউ কেউ সরস আলাপ-আলোচনাও করেন।
মিথিলা বলল, আগামীকাল তারাও ছাড়া পাচ্ছেন। তবে সকলের সঙ্গে বিদায় নিয়ে যাবেন বিকেলে।
হারুন বললেন, করোনার ফ্যাক্টরিতে দেখছি এতদিনেও করোনা তোমাদের কেশাগ্র স্পর্শও করতে পারেনি!
এ কথায় মিথিলা ও স্বপন দুজনই হেসে ওঠল। সেই হাসির রোলে একটা ছন্দ আছে।
