পুরো বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করেছে করোনা ভাইরাসের অতিসংক্রামক ধরন ‘ডেলটা’। ভাইরাসের এই ধরনের বিরুদ্ধে কোন টিকা কতটা কার্যকর, তা জানার চেষ্টায় চলছে নানা পরীক্ষা।
সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের নাজুক অবস্থার জন্য করোনা ভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্টকে (বি.১.৬১৭.২) দায়ী করা হচ্ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই ধরনকে ‘বিশ্বের জন্য উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই শঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে ইতিমধ্যে শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই ধরন।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মনিকা গান্ধীকে উদ্ধৃত করে ব্লুমবার্গ লিখেছে, যেসব টিকা এ পর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে, তার সবগুলোই ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো দেখা গেছে টিকা দেওয়ার পরও মানুষ সংক্রমিত হয়েছে, তবে তাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ ও অসুস্থতার মাত্রা অনেকটাই কম। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, ডেলটা ধরনের ক্ষেত্রে সব টিকার কার্যকারিতা সমান নয়।
এপ্রিল থেকে জুনে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ১৪ হাজার রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করে পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড। গত ১৪ জুন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা ফাইজারের একটি ডোজ নিয়েছেন, চার সপ্তাহ পর দেখা গেছে, তাদের ৩৬ শতাংশের ক্ষেত্রে এই টিকা ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পেরেছে। দুই ডোজের পর তা বেড়ে ৮৮ শতাংশ হয়েছে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা করোনা ভাইরাসের অন্য ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছিল।
পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, ফাইজার-বায়োএনটেকের এক ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৪ শতাংশ কোভিডে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছেন। আর দুই ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৬ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের গবেষণার বরাত দিয়ে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার এক ডোজ ‘ডেলটা ধরনের’ বিরুদ্ধে ৩০ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। আর দুই ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের ৬৭ শতাংশের ক্ষেত্রে এই টিকা সুরক্ষা দিতে পেরেছে। অথচ ইংল্যান্ডে পাওয়া আলফা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার দুই ডোজে ৭৪ শতাংশ কার্যকারিতা দেখা গেছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার এক ডোজ টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের কারো সংক্রমণ ঘটলেও ৭১ শতাংশ মারাত্মক অসুস্থ হননি বা হাসপাতালে যেতে হয়নি। আর দুই ডোজের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষার মাত্রা ৯২ শতাংশ।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গিয়েছিল, মডার্নার টিকা ৯৪ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পেরেছে। তবে তখনো ডেলটা ধরনের উদ্ভব হয়নি। মডার্নার টিকাও ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার মতো একই পদ্ধতিতে তৈরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির এক গবেষণার বরাত দিয়ে এনবিসি বস্টনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মডার্নার টিকার এক ডোজ ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ৮০ শতাংশ এবং দুই ডোজ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও জৈব প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘মডার্না’র টিকায় তৈরি হওয়া ‘অ্যান্টিবডি’র মাত্রাও ডেলটা ধরন ৭ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। মডার্না বলেছে, তাদের টিকা ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষেত্রে বেটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে।
জনসন অ্যান্ড জনসন (জেঅ্যান্ডজে) সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের এক ডোজের টিকা অতিসংক্রামক ডেলটা ধরনের বিরুদ্ধেও কার্যকর এবং টিকা নেওয়ার পর আট মাস পর্যন্ত এর কার্যকারিতা থাকে। সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন বলেছে, ভাইরাসের মূল ধরনটির বিরুদ্ধে তাদের টিকা যতটা কার্যকর, তার চেয়ে ডেলটা ধরনের বিরুদ্ধে সামান্য কম কার্যকর। তবে সাউথ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া বেটা ধরনের চেয়ে ভারতে শনাক্ত ডেলটা ধরনের বিরুদ্ধে এ টিকা বেশি কার্যকর।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছিল জনসনের টিকা। তবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কত শতাংশ থাকে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো তারা প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ কর্তৃপক্ষের সাবেক এক কমিশনারের বরাত দিয়ে এনবিসি বস্টনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেলটার বিরুদ্ধে জনসনের কার্যকারিতা ৬০ শতাংশের মতো।
