চীনের প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না-সিপিসির সেন্ট্রাল কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি শি জিনপিং বলেছেন, বহুপাক্ষিকতার আড়ালে একপাক্ষিক চর্চার বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। চীন কখনোই আধিপত্যকামী হবে না। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাবে না। চীন সবসময় উন্নয়নশীল বিশ্বের সদস্য থাকবে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অবশ্যই অল্পকিছু দেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে না, বরং সার্বজনীন স্বীকৃত হবে। সিপিসির ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘সিপিসি ও বিশ্ব রাজনৈতিক দল’ শীর্ষ ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগ ‘আইডিসিপিসি’ এ সম্মেলন আয়োজন করে। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি (জাপা), জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (মা-লে) নেতারা অংশ নেন। সম্মেলনে অংশ নেন বিশ্বের ১৬০টি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাঁচ শতাধিক শীর্ষ নেতা ও ১০ হাজারের বেশি প্রতিনিধি। এই শীর্ষ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জনগণের কল্যাণ :রাজনৈতিক দলের ভূমিকা’। প্রতিপাদ্যের ওপর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, মানবজাতির কল্যাণের পথে কোনো দেশ বা জাতিকে বাইরে রাখা হবে না। প্রতিটি দেশই উন্নয়নের সুযোগ ও অধিকার পাওয়ার সমান দাবি রাখে। সিপিসির উদ্দেশ্য হলো চীনের ১৪০ কোটি মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের পাশাপাশি মানবজাতির শান্তি ও উন্নয়নে কাজ করা। বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত বিশ্ব শান্তি ও উন্নতির জন্য কাজ করা।
শি জিনপিং বলেন, সিপিসি বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণে তাদের শক্তিকে কাজে লাগাতে চায়। করোনা মহামারি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করতে চীন তার প্রচেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখবে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে চীন সর্বাত্মকভাবে কাজ করবে। দারিদ্র্য দূরীকরণ ছাড়া সারা বিশ্বের মানুষকে আমরা সমান অধিকার দিতে পারব না। ১৬০টি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে দারিদ্র্য দূরীকরণ, টিকা, ধনী-দরিদ্র্য বৈষম্য কমানো এবং করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। চীনের প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, সিপিসি গঠনের শতবর্ষে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশ থেকে দেড় হাজারের বেশি অভিনন্দন বার্তা এসেছে।
সম্মেলনে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভার্চুয়ালি অংশ নেন। সম্মেলনে অংশ নেন বিএনপির ২৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে তারা অংশ নেন। প্রতিনিধি দলের মধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডক্টর মাহবুব উল্লাহ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, দলের ভাইস-চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহজাহান, আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ।
সম্মেলেন জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর নেতৃত্বে দলটির তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেন। রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে তারা সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। অপর দুই সদস্য হলেন—জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি ও পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা আল মাহমুদ।
সম্মেলনে জাপার পক্ষ থেকে বলা হয়, জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সময় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরতর হয় এবং চীন প্রথম বারের মতো চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নির্মাণ করে। চীন বাংলাদেশে বিদ্যুত্খাতে তখন প্রথম বারের মতো চট্টগ্রামের রাউজানে ৪২০ মেগাওয়াটের তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রে অর্থায়ন করে। এসব বিনিয়োগ ছিল চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক যে করোনা মহামারি তা মোকাবিলায় জাপা আশা করে চীন বাংলাদেশে ভ্যাকসিন তৈরি করবে। যাতে করে বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষকে অনতিবিলম্বে টিকার আওতায় আনা যায়। তিনি অক্সিজেন তৈরির ব্যাপারে বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভেন্টিলেটরসহ স্বাস্থ্যসামগ্রী উত্পাদনে চীনা সহায়তার আহ্বান জানান তিনি। বাবলু বলেন, জাপা বিশ্বাস করে কারো প্রতি শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতির মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রতিনিয়ত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে।
সম্মেলনে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়াসহ দলগুলোর নির্ধারিত নেতারা অংশ নেন। উল্লেখ্য, ১৯২১ সালের ১ জুলাই সিসিপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ এক গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে দলটি চীনের ক্ষমতায় আসে। তারপর থেকে ৭২ বছর ধরে দলটি চীন শাসন করে আসছে।
