সাজা দিলেই অপরাধ কমবে, এমন ধারণা ভুল ---------- প্রধান বিচারপতি

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২১, ২৩:১২

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ভার্চুয়ালি শুনানি হলো তিন ফাঁসির মামলার। এর মধ্যে দুটি মামলাই হচ্ছে স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের। যার দায়ে স্বামীদের হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। আর একটি হচ্ছে নিজ সন্তান হত্যার দায়ে পিতার ফাঁসি। এসব মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ শাস্তির রায় বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। ঐ রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিতদের করা আপিল শুনানিতে রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরা আইনি যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘ভারতের চেয়ে আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি (ল আ্য্যন্ড অর্ডার সিচুয়েশন) কোনো অংশেই খারাপ না। কিন্তু সেখানে ২০১৯ সালে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে ১২১ জনের আর আমাদের এখানে ৩২৭ জনের। তিনি বলেন, আমাদের এখানে স্ত্রী হত্যা মামলায় ৮০ ভাগ সাজা হচ্ছে। হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। এত কঠোর সাজার পরেও কি স্ত্রী হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে? হয়নি। সুতরাং সাজা দিলেই যে দুধের মধ্যে ভাসতে থাকবে এমন ধারণা ভুল। আর ফাঁসির দণ্ডও সমাজকে রক্ষা করে না। তবে যে সব মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড হবে সেখানে সেই দণ্ড দিতেই হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।

কঠোর লকডাউনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ খোলা রেখেছেন প্রধান বিচারপতি। সপ্তাহের মঙ্গল ও বুধবার শুধু ফাঁসির মামলার শুনানি গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই মোতাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বাসা থেকে ভার্চুয়ালি মামলার শুনানি গ্রহণ করেন। আইনজীবীরাও অংশ নেন বাসা থেকে। কোর্ট স্টাফরাও ছিলেন বাসায়। পুরো কোর্ট পরিচালিত হয় বাসা থেকে।

শুরুতে সন্তান হত্যার দায়ে পিতার ফাঁসির মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে শাশুড়ির ঝাড়ুর পিটুনি খেয়ে নিজ সন্তানকে হত্যা করেন দিনমজুর জসিম রাঢ়ি। সেই মামলায় তাকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। আপিলে তা বহাল রাখে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানিকালে বিচারপতিরা বলেন, মামলার রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, ভাত খাওয়ার সময় জসিমকে ঝাড়ুপেটা করেছেন শাশুড়ি। এতে তার নিজের জীবনের ওপর ঘৃণা ধরেছে। যার কারণে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সন্তান হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে তাকে কেন দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পরিবর্তে ৩০৪(খ) তে সাজা দেওয়া হবে না?

জবাবে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ বলেন, সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় দেখা যায় যে, যিনি ঝাড়ু দিয়ে পিটুনি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ হয়ে হয়তো তাকে বা তার মেয়েকে হত্যা করে থাকে। কিন্তু আসামি তা না করে নিজ সন্তানকেই হত্যা করেছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, এক্ষেত্রে দারিদ্র্য, অপমান ও দুঃখ কাজ করেছে। আপিল বিভাগের এই বেঞ্চে ছয় জন বিচারপতি রয়েছেন। আমরা জানি সন্তানদের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসা কতটুকু। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে জসিমকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে দ্রুত মুক্তি দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারকরা হলেন বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

প্রসঙ্গত সন্তান হত্যা মামলায় ২০০৭ সাল থেকে কারাগারে আছেন জসিম। এর মধ্যে ১৩ বছর ধরে আছেন কনডেম সেলে। আপিল বিভাগের আদেশ পৌঁছলে তিনি কনডেম সেল থেকে মুক্তি পাবেন। কারণ ইতিমধ্যে তার এই সাজা খাটা হয়ে গেছে বলে জানান আইনজীবীরা। তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা।

স্ত্রী হত্যা মামলায় স্বামীর যাবজ্জীবন

স্ত্রী হত্যা মামলায় মো. মামুন নামে এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল আসামির আপিল খারিজ করে এ রায় দেয়। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৫ সাল থেকে আসামি কারাগারে রয়েছেন। কনডেম সেলে আছেন ২০০৮ সাল থেকে। আসামি পক্ষে আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও নাহিদ মাহতাব এবং রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরসেদ শুনানি করেন। এছাড়া স্ত্রী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মহসিন মোল্লার আপিলের ওপর আংশিক শুনানি হয়েছে। আজ বুধবার পরবর্তী শুনানি হবে।