করোনা মহামারির সংক্রমণ রোধের কার্যকর পদক্ষেপ হইল সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলা। ইহার জন্য প্রয়োজন কঠোর লকডাউনের বাস্তবায়ন। সম্প্রতি দেশে করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বাড়িয়া যাইবার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে এবং উহা চলমান রহিয়াছে। ইহার পূর্বেও সরকার করোনা সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন সময় লকডাউন, বিধিনিষেধ আরোপ করিয়াছিল। সংক্রমণ রোধে লকডাউন কিংবা বিধিনিষেধ অপরিহার্য হইলেও ইহা আমাদের নূতন এক বাস্তবতার মুখে দাঁড় করাইয়াছে। লকডাউনে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছে দেশের শ্রমজীবী ও খাটিয়া খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। করোনাভীতি আর জীবনপ্রীতি—এই দুইয়ের টানাপড়েনে তাহাদের জীবন ওষ্ঠাগতপ্রায়। লকডাউনের কারণে যেই সকল মানুষ দৈনিক মজুরির বিনিময়ে কাজ করিত, তাহারা কর্মহীন হইয়া পড়িয়াছে। কর্মহীন হইয়া পড়িয়াছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের হাজার হাজার কর্মী। রোজগার, কর্ম না থাকায় ঘরে বসিয়া সঞ্চয় ভাঙিয়া খাইবে, এমন পরিস্থিতিও নাই এই শ্রেণির মানুষের। তাহাদের বাড়িতে নাই খাবারের জোগান, শিশুদের মুখে তুলিয়া দিবার মতো খাদ্যের সংস্থানটুকুও করিতে পারিতেছেন না তাহারা। এই কথা ঠিক যে, মহামারির বিস্তার ঠেকাইতে কিংবা জীবন বাঁচাইতে লকডাউনের বিকল্প আপাতত কিছু নাই, কিন্তু জীবনধারণের নিমিত্তে ন্যূনতম চাহিদা তো পূরণ করিতে হইবে। অথচ নিম্ন আয়ের, খাটিয়া খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জীবনধারণের সেই ন্যূনতম অবলম্বনও লকাডাউনের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়িয়া গিয়াছে।
করোনার বিস্তার ঠেকাইতে লকডাউন এবং দীর্ঘ মেয়াদে ছুটির কারণে দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়াছে, কর্মহীন হইয়া পড়িয়াছে বহু শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। নিম্নমধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের অনেকেই চাকরি হারাইয়াছেন, চাকরি হারাইবার আশঙ্কায় রহিয়াছেন অনেকেই। শহর ছাড়িয়া গ্রামে চলিয়া গিয়াছেন এবং যাইতেছেন অনেক মানুষ। করোনার অভিঘাতে আয় কমিয়া যাওয়ায় শহরের তুলনায় গ্রামে জীবনযাপন অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী হওয়ায় তাহারা শহরের ভাড়া বাসাটি পর্যন্ত ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, করোনার আঘাতে দেশে নূতন করিয়া দরিদ্র হইয়াছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। দুঃখজনক ব্যাপার হইল নিম্ন আয়ের খাটিয়া খাওয়া মানুষেরা সকলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও নাই। বিপুলসংখ্যক মানুষ লকডাউনে অনিশ্চিত আয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে, তাহাদের দুই বেলা অন্নসংস্থান করিবার ব্যাপারটিও চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
লকডাউন কার্যকর করিবার লক্ষ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম খাদ্যচাহিদা এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। খাটিয়া খাওয়া মানুষের জন্য খাদ্যসংস্থান না করিয়া এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা না করিয়া তাহাদের ঘরে থাকিতে বাধ্য করা অমানবিক। উন্নয়নশীল বিশ্বে করোনাকালীন বিভিন্ন প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হইয়াছিল, এই প্রণোদনার উদ্দেশ্য ছিল করোনার অভিঘাতে ব্যবসায়-বাণিজ্য টিকাইয়া রাখা। কিন্তু সেই সকল প্রণোদনার বেশির ভাগই ছিল শিল্পকারখানা, ব্যবসায়-বাণিজ্যকেন্দ্রিক; বিশেষ করিয়া, যেই সকল প্রতিষ্ঠান উত্পাদন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। অথচ সাধারণ খাটিয়া খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের নিকট সরাসরি অর্থ কিংবা সহায়তা পৌঁছায় নাই। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে ধনী-গরিবনির্বিশেষে সকলকে কোভিডকালীন নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হইয়াছে। অর্থনীতিকে টিকাইয়া রাখিতে হইলে সমাজের ধনী-গরিব সকলের হাতেই অর্থের সরবারাহ থাকিতে হয়, শুধু উত্পাদকের নিকট অর্থ থাকিলেই চলে না, যিনি উত্পাদিত পণ্য কিনিবেন তাহার হাতেও তো অর্থ থাকিতে হইবে! ব্রিটেন-আমেরিকায় সমালোচনার মুখেও অফিস-আদালত, ব্যবসায়-বাণিজ্য কেন্দ্র খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে অর্থনীতিকে সচল রাখিবার জন্য। মানুষের আয়ের পথ বন্ধ করিয়া কোনোরূপ বিধিনিষেধ সফল হইতে পারে না।
