একটু ভূমিকম্প হলে সবাই আঁতকে ওঠে। একই দিনে পরপর বারবার ভূকম্পন শুরু হলে তো কোনো কথাই নেই। গতকালও একবার কেঁপে উঠল দেশ। কিছু দিন আগে সিলেট এলাকায় দিনে আটবার পর্যন্ত ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় মানুষের মনে মহা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সিলেট থেকে ঢাকা বেশি দূরে নয়। তাই ঢাকাবাসীর মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে ভূমিকম্পের ভয়ে যেমন আতঙ্ক লক্ষণীয়, বর্তমানে উন্নত বিশ্বে তেমন আতঙ্ক দেখা যায় না। প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের যুগে বিজ্ঞ মানুষেরা বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ঠেকানোর নানা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। তবুও প্রকৃতির কাছে মানুষ চরম অসহায়। যেমন করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে বর্তমানে সারা বিশ্ব এক টালমাটাল সময় পার করছে। কিন্তু মানুষ নাছোড়বান্দা। প্রাকৃতিক যে কোনো বিপর্যয় মোকাবিলা করতে একসময় একটা উপযুক্ত উপায় খুঁজে বের করবেই। যেমনটা করেছে ভূমিকম্পের দেশ বলে খ্যাত জাপান।
দ্বীপদেশ জাপানে অনেকগুলো সুপ্ত ও জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ফলে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কমবেশি ভূকম্পন হয়ে থাকে। আমি উচ্চশিক্ষার জন্য সাড়ে পাঁচ বছর জাপানে ছিলাম। প্রথম দিকে ভূমিকম্পের একটু ঝাঁকুনি পেলেই খুব ভয় পেতাম। সেমিনার বা ক্লাসের সময় ভূমিকম্প হলে মনোযোগ ভিন্ন দিকে চলে যেত। কিন্তু আশপাশে সবার দিকে তাকিয়ে দেখতাম তারা নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তাত্ক্ষণিকভাবে কী করতে হবে, তাদের ছোটবেলা স্কুলেই শেখানো হয়েছে। বাড়ি, অফিস, ক্লাসরুম সবকিছুর দেওয়ালে কাঠ-প্লাইউডের আলাদা সংযোজন রয়েছে। হঠাত্ কোনো কিছু খুলে মাথায় পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। প্রতিটি কক্ষে ফায়ার এক্সস্টিংগুইসার লাগানো আছে। তাছাড়া স্মোক ডিটেক্টরের দ্বারা আগুন বা ধোঁয়ার সন্ধান পেলে সাইরেন বেজে ওঠে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ভূমিকম্পের মাত্রা বেশি হলে বিদ্যুত্সংযোগ বন্ধ হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
আমার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ফ্যামিলি ছাত্রাবাসটি ছিল বেশ বড় ও উঁচু। আমরা আটতলায় থাকতাম এবং সেখানে লিফট দিয়ে ওঠানামা করতাম। একদিন রান্না করা অবস্থায় বড় ভূমিকম্প হলো। মনে হলো ভবনটি কাত হয়ে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুত্ ও গ্যাস-সংযোগ বন্ধ হয়ে গেল। তবে ভবনটিও আবার যথারীতি সোজা হয়ে দাঁড়াল। পরে জেনেছি, ভবনটি ৮-৯ মাত্রার ভূকম্পন সহনশীল করে তৈরি করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে বিদ্যুত্ চালু হলে টিভিতে দেখলাম ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। রাস্তায় কোথাও ফাটল দেখা গেছে। সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে নিকটবর্তী সমুদ্রসৈকতগুলোতে। কয়েকটি চলন্ত গাড়ি ছিটকে পড়েছে রাস্তা থেকে। এছাড়া সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। ভূমিকম্প প্রবণতা বেশি হওয়ায় জাপানিরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বহু গবেষণা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ায় জানমালের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এই ভয়ংকর দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন।
পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন সুখের প্রত্যাশা করে অবুঝ মানুষ। কিন্তু এই ধরাধামে কিছুতেই তা শতভাগ সম্ভব নয়। এখানে রোগ, শোক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে কোনো সময় আসবেই। এজন্য আগাম প্রস্তুতি থাকলে মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মোকাবিলা করার সাহস ও সুযোগ তৈরি হয়। তখন ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়। এজন্য প্রয়োজন অনেক গবেষণা, অনেক সেমিনার, অনেক পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। সেসব পরিশ্রমের ফলাফল জনগণকে যথাসময়ে অবহিত করে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হয়।
কিন্তু আমাদের দেশে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেটা নিয়ে চ্যাঁচামেচি হয়। আগে কেন ব্যবস্থা নিই না সেটাই আমাদের ভীষণ দুর্বলতা। বাংলাদেশে ‘দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা লক্ষাধিক’ (জাগো নিউজ ২৪.কম জুন ০৮, ২০২১)। সারা দেশে গগণচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা বাড়ছে। অল্প জায়গায় বড় বড় স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আমাদের চারদিকে ভূমিকম্প বলয় তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সিলেট এলাকায় এক দিনে আটবার পর্যন্ত ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় মানুষের মনে মহা আতঙ্ক শুরু হলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে উঠেছেন। কিন্তু সেই পর্যন্ত গিয়েই ক্ষান্ত। আমাদের দেশের ভূমিকম্প বিশারদগণ গত কয়েক বছর যাবত্ গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কিছু ভয়ংকর কথা শুনিয়েছেন। সেগুলো নিয়ে কী কাজ হয়েছে, তা জনগণকে তেমনভাবে অবহিত করা হয়নি অথবা মানুষ সেগুলোর ব্যাপারে কেন সচেতন হয়নি তার কোনো জবাবদিহি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ বছর হঠাত্ ভূমিকম্পের ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে মানুষ বেশি ভয় পাচ্ছে—যা এই করোনা অতিমারির সময়ে মানুষকে আরো বেশি দুর্বল করে তুলেছে।
‘ঢাকায় ভূমিকম্পের প্রাণহানির মূলে থাকবে আগুন’। ভূমিকম্পে গ্যাসলাইন বিস্ফোরিত হবে। ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের বড় আগুন জ্বললে মানুষ পুড়ে মারা যাবে।’ নগরে হঠাত্ বন্যা হবে। বিদ্যুতের তার পানিতে পড়ে মানুষ বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হবে। অন্ধকারে ডুবে যাবে শহর। রাস্তা ডুবে ব্লক হয়ে যাবে। খাওয়ার পানির সংকট হবে। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারবে না। (ইত্তেফাক জুন ১৭, ২০২১)।
‘ঢাকায় ভবনের দুর্বলতা গ্যারেজ, ধসে পড়বে নিচতলা’ কারণ, নিচে শুধু কলাম, দেওয়াল নেই। একটি ভবনের দুই ধরনের ওজন থাকে। একটি ‘ডেডলোড’ বা বিল্ডিংয়ের নিজের ওজন। অন্যটি ‘লাইভলোড’ বা অন্যান্য সবকিছুর ওজন। বিদেশে গাড়ি পার্কিং তৈরি করা হয় বিল্ডিংয়ের ভেতরের কোনো তলায় অথবা ছাদে। বিশেষ করে সুপার মার্কেটের সব ছাদেই বিশাল গাড়ি পার্কিং লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে পার্কিং করা হয় মার্কেটের নিচে যত্সামান্য, বাকিটা সরকারি রাস্তা দখল করে রাখা হয়। এটা যানজটের অন্যতম কারণ।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান বলেছেন, ‘ঢাকার ভবনগুলো ৭-এর বেশি প্রেশার নিতে পারবে না’। (সময় নিউজ, জুন ৩, ২০২১)। ‘ঢাকায় চার লাখ বড় ভবন রয়েছে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০ হাজার ধসে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।’ ইন্ডিয়া, ইউরেশিয়া, বার্মা—এই তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ। একটি জোরালো ভূকম্পনের শক্তি জমা হয়ে আছে এখানে।
১৮৯৭ সালের আসামের ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ১২৪ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ১২ জুন। প্রতি ১০০ বছর পরপর বড় মাত্রার ভূমিকম্প আবার ফিরে আসে। সিলেটের ছোট ছোট মাত্রার ভূমিকম্প সেগুলো পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ডাউকী ফল্টের পূর্ব প্রান্তে গত ৫০০ বছরেও বড় ভূমিকম্প হয়নি। তাই আরাকান, সিলেট, ডাউকী ও আসামেও উত্পত্তি হতে পারে এই বড় ভূমিকম্পের।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানার কৌশল এখনো আবিষ্কৃত না হওয়ায় অন্যান্য দুর্যোগের মতো এর বিরুদ্ধে আগাম কর্মসূচি নেওয়ার উপায় নেই। প্রয়োজন শুধু সতর্কতা। শক্তিশালী ভূমিকম্প সহনশীল ভিত্তির যথাযথ টেস্ট পাশ না করলে ঢাকাসহ দেশের আর কোথাও কোনো উঁচু ভবন বানানোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। ভুয়া, অবৈধ অনুমতি ঠেকানোর জন্য সর্বাগ্রে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বাচ্চাদের জানানোর জন্য জাপানের মতো স্কুল থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। তাছাড়া প্রতিটি স্কুল, অফিস, মহল্লা সব জায়গায় প্রতি মাসে বা তিন মাসে একবার ভূমিকম্প সচেতনতার মহড়া দেওয়া উচিত। প্রতি এলাকায় কিশোর-যুবকদের নিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জামসহ ভূমিকম্প উদ্ধারকারী টিম তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিটি ক্লাবেও বাধ্যতামূলকভাবে ভূমিকম্প উদ্ধারকারী টিম তৈরি ও বিপদের সময় এক হুইসেলে সাহায্যের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কারণ, তাত্ক্ষণিকভাবে তো আর ইন্টারনেটের সংযোগ খুঁজে পাওয়ার উপায় থাকবে না। সেজন্য জরুরি ভিত্তিতে যে কোনো আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মানসিকতা তৈরির কর্মসূচি এখনই নিতে হবে ও সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
n লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান।
