‘অর্জন’ শব্দটি বর্তমান সময়ে আমাদের সবার কাছে বেশ লোভনীয় ও আকাঙ্ক্ষিত। যার অর্জনের পাল্লা যত বেশি ভারী, তার মূল্য আমাদের সমাজে তত বেশি। নিজের অর্জনের তালিকা লম্বা করার জন্য কী না করছি আমরা! কেউ উদ্যোক্তা হচ্ছি; কেউ ভূরি ভূরি অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করছি; কেউ আবার গোটা গোটা বই শেষ করে ফেলছি; কেউ নিজের লুক্কায়িত প্রতিভা উন্মোচন করে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়ে নিচ্ছি। মোট কথা, কোনোভাবে বেকার নির্লিপ্ত হয়ে বসে না থাকাটাই এখন মুখ্য আমাদের কাছে। তদুপরি লকডাউনে এই নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘরে বসে থাকার সময়টাতে প্রোডাক্টিভ থাকার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এমন সময়ে আমরা অধিকাংশই নিজের অজান্তে নিজেকে প্রশ্ন করি যে পিছিয়ে পড়ছি কি না, বা নিরর্থক সময় পার করছি কি না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ প্রোডাক্টিভিটির এই অদৃশ্য দৌড়ে নিজেদের শামিল করতে উদ্গ্রীব থাকে। উপরন্তু, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলো তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কে কার থেকে কতখানি পিছিয়ে বা এগিয়ে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো উত্পাদনশীলতার অদৃশ্য এই দৌড়ের মাঝে কারোর নির্বিকার সময় কাটানো বা আপাতত বস্তুগত মূল্যহীন কোনো কাজকে খাটো করে দেখা হয়।
একটি বিশ্ব অতিমারি চলাকালে নিজের মতো করে ভালো থাকার গুরুত্ব যে কোনো অংশে কম নয়, সেই উপলব্ধি আমাদের সবার থাকা উচিত। কীভাবে প্রোডাক্টিভ হতে হবে তার ১০টি কৌশল নিয়ে ভিডিওর কোনো কমতি নেই। ফেসবুক, ইউটিউব,পত্রপত্রিকায় নিজেকে সৃষ্টিশীল ও উত্পাদনশীল রাখার মোটিভেশনাল স্পিচের ছড়াছড়ি। কিন্তু নিজেকে উত্পাদনশীল রাখার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে। আমরা যেন কোনোভাবেই নিজেকে কোনো ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না জড়াই, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বর্তমানে আমরা যে অতিমারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে শারীরিক অসুস্থতার ভয়াবহতা থেকে মানসিক অসুস্থতা কোনো অংশে কম ভয়াবহ নয়। এমতাবস্থায় কীভাবে নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ রেখে অবসর সময়টাকে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করা অত্যন্ত জরুরি। গত ১৪ মে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি থেকে ‘করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব’ শীর্ষক একটি জরিপে দেখা যায়, ‘জীবন অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে’ এমনটা ভেবে হতাশাগ্রস্ত আছে প্রায় ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ।
এই অর্থহীনতা কাটানোর জন্য বা হতাশা দূর করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নিজেকে জানা এবং বোঝা। ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে অবগত থাকা অনেক জরুরি। নিজের রুচি ও পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মক্ষম থাকার চেষ্টা করতে হবে। বন্ধু বা পরিচিত কারো প্রাপ্তির মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার না করে নিজের বেঞ্চমার্ক নিজেরই তৈরি করা উচিত। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক আলবার্ট শুইজারের সুখ ও সফলতাবিষয়ক একটি উক্তি এ বিষয়ে অবশ্য উল্লেখ্য, ‘সাফল্য সুখের মূল বিষয় নয়। সুখ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আপনি যা করছেন, তা যদি ভালোবাসেন তবে আপনি সফল হতে পারবেন।’ অতএব, প্রশান্তি ও সফলতা যে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ও আপেক্ষিক, অর্থাত্ ব্যক্তিবিশেষে যে তার আলাদা সংজ্ঞা থাকতে পারে, তা নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হবে। প্রোডাক্টিভ থাকার জন্য যে মানসিক শক্তির প্রয়োজন, সেই শক্তির উত্স একেক জনের একেক রকম হতে পারে। কেউ চাইলে বিকেলে একটু অলস সময় কাটাতে পারে; আপাতদৃষ্টিতে বস্তুগত গুরুত্বহীন কাজ, যার মূল্য হয়তো অন্যের কাছে নেই, কেউ চাইলে সে কাজ নিয়ে কিছু সময় ব্যস্ত থাকতে পারে। সর্বোপরি নিজেকে কর্মক্ষম ও সক্রিয় রাখতে চাইলে নিজেকে উজ্জীবিত রাখার সুযোগ নিজেরই তৈরি করতে হবে। প্রোডাক্টিভ থাকাটাকে কোনোভাবেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কাতারে না ফেলে নিজের ইচ্ছা, সক্ষমতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করাই শ্রেয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
