বিশ্বের অন্যান্য শহরের তুলনায় আয়তনে ছোট একটি শহর ঢাকা। অথচ বিপুল জনসংখ্যায় এটি ঠাসা। অতিরিক্ত জনসংখ্যার যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে শহরটির প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত! একটি আদর্শ শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যানজটমুক্ত রাস্তাঘাট। যানজটের সংকট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে এবং একটি আধুনিক যুগোপযোগী, নিরাপদ নগর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফ্লাইওভার বা উড়ালসেতুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো ২০০৪ সালে মগবাজার ফ্লাইওভার উন্মুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে রাজধানী জুড়ে আরো ছয়টি ফ্লাইওভার চালু করা হয়। চট্টগ্রামে তিনটিসহ সারা দেশে রয়েছে বেশ কিছু উড়ালসেতু। সড়কযোগাযোগে তো বটেই, নগরীর চেহারায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বিশালাকায় এসব স্থাপনা। যানজট নিরসনের পাশাপাশি ফ্লাইওভারের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
সড়কের ওপর বড় বাজেটে তৈরি ফ্লাইওভারগুলোর ওপরটা কাজে লাগলেও বিশাল এসব স্থাপনার নিচে খালি পড়ে থাকছে বিপুল পরিমাণ জায়গা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের সাতটি উড়ালসেতুর নিচে প্রায় ২৯ কিলোমিটার জায়গা রয়েছে, যা নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যাতায়াত ও পরিবহনব্যবস্থা পালটে যাওয়ার কারণে সন্ধ্যার পর অনেক উড়ালসেতুর নিচের অংশ এবং পাশের রাস্তাঘাট হয়ে ওঠে একপ্রকার জনমানবশূন্য। কোনো নজরদারি নেই বলে জায়গাগুলো হয়ে উঠেছে চোর, ছিনতাইকারী আর মাদকসেবীদের আখড়া হিসেবে। পাশাপাশি চলে অনৈতিক কর্মকাণ্ড। আবার যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা-বর্জ্য ফ্লাইওভারের নিচের জায়গাগুলোকে পরিণত করছে আবর্জনার ভাগাড়ে। কোথাও কোথাও অপরিকল্পিতভাবে অস্থায়ী আবাস গড়েছে ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। কোনো অংশ জুড়ে রয়েছে করপোরেশনের ঝাড়ুদারদের অস্থায়ী ঘর। ফ্লাইওভারের নিচে এসব অপরিকল্পিত আবাস স্থাপনা নগরকে অনিরাপদ করে তোলে এবং নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায়। এছাড়া ফ্লাইওভারের নিচের ফাঁকা জায়গার বড় একটি অংশ দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংগঠনের অফিস, কুঁড়েঘর তৈরি করে কারো চলছে ভাড়া খাটানোর ব্যবসা, গাড়ির গ্যারেজ, ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড, মাছ-মাংস ও শাকসবজির বাজার, ভাতের হোটেল ইত্যাদি।
কিন্তু কর্তৃপক্ষ চাইলে যথাযথ পরিকল্পনায় শহরের বুকে অত্যন্ত মূলবান এসব জায়গাকে পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। কম আলো-বাতাসে হয় এমন ফুল-ফলাদি গাছের ছোট ছোট বাগান করা যায়। বিনোদনের জন্য নান্দনিক পার্ক করা যায়, যার দৃষ্টান্ত ভারতের মহারাষ্ট্র ও ব্যাঙ্গালুরুর ফ্লাইওভারগুলো। পথশিশুদের বিনোদনকেন্দ্রও গড়ে তোলা সম্ভব। হকারদের কর্মসংস্থান করে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যায়। এর সঙ্গে ফুটপাতে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত ও ছিন্নমূল মানুষদের ফ্লাইওভারের নিচে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করা যায়। একই সঙ্গে ছোট ছোট প্রদর্শনীকেন্দ্র অথবা মুক্ত স্থান, এটিএম বুথসহ অনেক প্রকল্প কার্যকর করা সম্ভব এসব অব্যবহূত স্থানে। সিঙ্গাপুরে উড়ালসড়কের নিচের অংশে সবুজ বৃক্ষরাজির পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের ক্যাম্প ও বিশ্রামাগারও রয়েছে। সুন্দর পরিকল্পনায় ছোট ছোট ফলমূল ও সবজির দোকান, পুরোনো বইয়ের দোকান কিংবা রেস্তোরাঁর ব্যবসা রয়েছে জাপান, হংকংসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে। কানাডা, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গায় পার্ক, লাইব্রেরি, জলাশয়সহ নানা আয়োজনে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে। কফিশপ, ইনডোর গেমসের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এখানে। আমাদের দেশে রাস্তা দখল করে প্রাইভেট কার পার্কিং করা হয়। সেগুলো ফ্লাইওভারের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায়। এতে সরকার যেমন রাজস্ব পাবে, তেমনি জনগণ পাবে যানজটমুক্ত শহর। বিদেশে এমন ব্যবস্থা বহু আগে থেকে প্রচলিত।
অন্যান্য দেশের তুলনা দেখে যারা এদেশে সেসব ‘সম্ভব’ করার ‘সম্ভাবনা’কে নিছক কথার কথা ভাবছেন, তারা একবার ঘুরে আসতে পারেন দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর জিঞ্জিরা-আগানগর অংশে। সেতুটির ঐ অংশের নিচে রয়েছে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা মাছ-মাংস ছাড়াও বিভিন্ন দ্রবের বাজার। আছে ইনডোর খেলাধুলার সুরক্ষিত ব্যবস্থা। রয়েছে আধুনিক পাবলিক টয়লেটও। ফ্লাইওভারের নিচের জায়গায় চাইলেই এত কিছু করা সম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত উড়ালসেতুর নিচের জায়গাগুলো ইতিবাচক ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা। এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে একদিকে যেমন নগরের সৌন্দর্য বাড়বে, অন্যদিকে তা নগরে সবুজের পরিমাণ বাড়ানোর সঙ্গে নাগরিকদের বিভিন্ন চাহিদা মেটানোর বিকল্প ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এভাবে সামাজিক অপরাধ নিরসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি হবে আরো সমৃদ্ধ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
