ট্র্যাজিক হিরো দিলীপ কুমারের জীবনাবসান

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ২২:২৫

চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ‘ট্র্যাজেডি কিং’ খ্যাত দিলীপ কুমার। অসংখ্য ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীকে কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন ‘মুঘল-ই-আজম’-এর সেই শাহাজাদা সেলিম! গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মুম্বাইয়ের পি ডি হিন্দুজা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ৯৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)। বাদ আসর এই প্রবীণ অভিনেতাকে মুম্বাইয়ের জুহু কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এর আগে শেষবারের মতো তার মরদেহ আনা হয়েছিল অভিনেতার পালি হিলের বাড়িতে।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে ২৯ জুন থেকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি ছিলেন দিলীপ কুমার। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি। তার স্ত্রী সায়রা বানুও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন। বিবাহিত জীবনে দিলীপ-সায়রা দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন হিন্দি সিনেমার স্বর্ণযুগের ‘প্রথম সুপারস্টার’ দিলীপ কুমার।

ভারতীয় চলচ্চিত্র যে কজন হাতে গোনা অভিনেতার হাত ধরে বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, দিলীপ কুমার তাদের একজন। তিনি ছিলেন বিরল ঘরানার একজন অভিনেতা। তাকে হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার অভিনয়, ম্যানারিজম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সম্মোহিত করে রেখেছে। এমনকি এখনো নতুন অভিনেতারা যখন হিন্দি সিনেমায় পা রাখেন, অনেকেই দিলীপ কুমারের ম্যানারিজমের প্রভাব কাটাতে পারেন না। হালের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানও দিলীপ কুমারের অভিনয়শৈলী অনুসরণ করেন বলে চলচ্চিত্র সমালোচকেরা বলে থাকেন।

অভিনেতা হিসেবে তার সাধনা কোন পর্যায়ে ছিল, তা এক সাক্ষাত্কারে নিজেই জানিয়েছিলেন দিলীপ কুমার। তিনি বলেন, ‘শুধু কীভাবে সেতার ধরতে হয় তা জানতে আমি কয়েক বছর ধরে সেতার বাজানো শিখেছি।’ যখন বয়স বাড়তে থাকে, তখন রোমান্টিক নায়ক থেকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৬ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর চলচ্চিত্রে অভিনয় বন্ধ রেখেছিলেন। এভাবেই নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দিলীপ কুমার। তাকে বলা হয় বলিউডের প্রথম স্বপ্রতিষ্ঠিত সুপারস্টার।

বলিউডে প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারে ‘জোয়ার ভাটা’, ‘আন’, ‘আজাদ’, ‘দেবদাস’, ‘জুগনু’, ‘দিদার’, ‘দাগ’, ‘আন্দাজ’, ‘মুঘল-ই-আজম’, ‘গঙ্গাযমুনা’, ‘মধুমতি’, ‘নয়া দৌড়’, ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘ক্রান্তি’, ‘কর্মা’, ‘শক্তি’, ‘সওদাগর’, ‘মশাল’সহ আনুমানিক ৬৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

দিলীপ কুমারের মৃত্যুতে ভারতসহ বাংলাদেশের মানুষের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। জাতীয় পার্টি- জাপা চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের দিলীপ কুমারের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। এছাড়াও শোক জানিয়েছেন জাসদ (ইনু) ও ওয়ার্কার্স পার্টি।

বলিউডের আরেক কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন এক টুইটে লিখেছেন, “একজন প্রতিষ্ঠান চলে গেলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে ‘দিলীপ কুমারের আগে’ ও ‘দিলীপ কুমারের পরে’ আলাদা অধ্যায় লিখতে হবে। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আমি গভীরভাবে শোকাহত।”

ফল ব্যবসায়ীর সন্তান ইউসুফ খান থেকে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সুপারস্টার হয়ে ওঠেন। প্রথম জীবনে তিনি হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার। ছবির শুটিং দেখার শখ ছিল। শুটিং দেখতে গিয়েই চোখে পড়েন তত্কালীন প্রভাবশালী অভিনেত্রী দেবিকা রানির। তার হাত ধরেই পা রাখেন রুপালি জগতে। বদলে যায় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস। ইউসুফ খান রোমান্টিক অভিনেতার জন্য ঠিক নাম নয় বলে হিন্দি কবি নরেন্দ্র শর্মা তিনটি নাম প্রস্তাব করেন—জাহাঙ্গীর, ভাসুদেব ও দিলীপ কুমার। ইউসুফ খান নিজেই বেছে নেন ‘দিলীপ কুমার’ নামটি।

দিলীপ কুমারের জন্ম ১৯২২ সালে অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারে। তার পারিবারিক নাম ইউসুফ খান। তিনি পাঠানদের অন্যতম গোত্র আওয়ান পরিবারের সন্তান। তারা ছিলেন ১২ ভাইবোন। বাবার নাম লালা গুলাম সরোয়ার। বাবা ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ফলের জমজমাট ব্যবসা ছিল তার। ত্রিশের দশকের শেষ দিকে ইউসুফ খানের পরিবার স্থায়ীভাবে মুম্বাইয়ে বসবাস শুরু করে। সেখানে তিনি একটি ক্যান্টিন চালাতেন এবং স্থানীয় বাজারে শুকনো ফল সরবরাহ করতেন।

দিলীপ কুমার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘জোয়ার ভাটা’ মুক্তি পায় ১৯৪৪ সালে। ১৯৬৬ সালে বলিউডের সাড়া জাগানো অভিনেত্রী সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে তিনি সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি কামিনী কৌশল, মধুবালার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তবে তিনি বিয়ে করেন তার চেয়ে ২২ বছরের ছোট অভিনেত্রী সায়রা বানুকে। ১৯৮০ সালে তিনি আসমা নামে একজনকে বিয়ে করেন। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই সেই সম্পর্কের ইতি টানেন। দিলীপ কুমার নিজের আত্মজীবনী লিখেছেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘দ্য সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড দ্য শ্যাডো’ (অনুলেখক উদয় তারা নায়ার) জীবনের এক আশ্চর্য আলেখ্য।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। আট বার তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয় করেছেন। ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৪ সালে পেয়েছেন হিন্দি সিনেমাজগতের সবচেয়ে বড় সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’। ভারত সরকার তাকে ১৯৯১ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০১৫ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত করে। তিনি রাজ্যসভার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে মুম্বাই শহরের সাম্মানিক শেরিফ পদটি অলংকৃত করেন তিনি। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ প্রদান করে। তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার লাভ করেন।