করোনা নমুনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ প্রদানের অভিযোগে এক বছর আগে গ্রেফতার সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার বালু আত্মসাতের তথ্য ও প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। বালু আত্মসাতের অভিযোগে সাত জন ব্যবসায়ীর দায়ের করা সাতটি মামলার চার্জশিট ইতিমধ্যে প্রদান করেছে সিআইডি। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মোট ১৮টি মামলার মধ্যে একটি মামলায় আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এছাড়া র্যাব বাদী হয়ে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি মামলার চার্জশিট প্রদান করেছে।
অপরদিকে, দায়েরকৃত মামলাগুলোর মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) একটি, উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি, সিআইডিতে তিনটি এবং দুদকে দায়ের হওয়া দুটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ, করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়া ও রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ৬ জুলাই র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। এর পর দিন ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে র্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। একই দিন উত্তরা পশ্চিম থানায় ভুয়া করোনা রিপোর্ট প্রদান ও সাহেদ করিমের বাড়ি থেকে জাল নোট উদ্ধারের ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে। এরপর থেকে সাহেদ পলাতক ছিল। ঐ বছরের ১৭ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরা থেকে সাহেদকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র্যাব। সাতক্ষীরার দেবহাটা থানায় র্যাব বাদী হয়ে সাহেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র আইনের মামলাটির চার্জশিট প্রদান করেছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সাহেদের বিরুদ্ধে র্যাবের দায়ের করা তিনটি মামলার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। মামলা তিনটি এখনো বিচারাধীন। সাহেদ করিম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
বিদেশে টাকা পাচার, প্রতারণা করে টাকা আত্মসাত্, ভুয়া করোনা রিপোর্ট প্রদান ও মানুষকে ভয়ভীতির অভিযোগে পুলিশ সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় ১০টি ও উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এই ১১টি মামলার মধ্যে ৯টি মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। বাকি দুটি মামলার মধ্যে একটি ডিবি ও একটি উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তদন্ত করছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ১১ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে উত্তরা পশ্চিম থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। এই মামলাটির প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফিনান্সিয়াল ক্রাইম) হুমায়ুন কবীর বলেন, লকডাউনের কারণে মামলার তদন্তের তথ্য পেতে একটু সময় লাগছে। তবে আমরা তদন্তে ১১ কোটি টাকার বেশি পাচারে তথ্য পেয়েছি। শিগিগর এই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।
উত্তরায় সাহেদ করিমের গাড়িতে মদ ও ফেনসিডিল রাখা এবং একটি অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় পুলিশ পরিদর্শক এস এম গাফফারুল আলম বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় আদালত সাহেদ করিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। অপর মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলা তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগিগর এই মামলায় চার্জশিট দেওয়া হবে।
বালু আত্মসাতের মামলায় চার্জশিট
সিআইডির মামলা তদন্তকারী একটি সূত্র জানায়, বালু আত্মসাতের অভিযোগে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাতটি মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে সিআইডি। এর মধ্যে উত্তরায় ইমতিয়াজ হাবিব সিনহা নামে এক বালু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫৮ লাখ টাকার বালু গ্রহণ করে তার মূল্য পরিশোধ না করার ঘটনায় একটি মামলায় চার্জশিট প্রদান করেছে। এ মামলায় সাহেদ করিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দির ভিত্তিতে সিআইডি তার বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করে। বালু ব্যবসার প্রতারণা নিয়ে সাহেদের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের হয়। মামলাগুলোতে সাহেদের বিরুদ্ধে বালু ব্যবসায় সাত জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার বালু গ্রহণ করে মূল্য পরিশোধ না করার অভিযোগ করা হয়েছে।
সিআইডির অপর একটি সূত্র জানায়, সাহেদের বিরুদ্ধে ৩৬ লাখ টাকার মালামাল চুরির অভিযোগে আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী বাদী হয়ে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা করেন। এই মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সাহেদ করিমকে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মালামাল চুরির কথা স্বীকার করেন। চুরির কাজে জড়িত সহযোগীদের নাম এখনো জানা যায়নি। এ কারণে এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানায়, পদ্মা ব্যাংকের ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক বাদী হয়ে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন দুদকে। এছাড়া এনআরবি ব্যাংক থেকে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের ঐ সহকারী পরিচালক বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেন। মামলা দুটি এখনো তদন্তাধীন।
