প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হইয়াছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ভালো দিকের পাশাপাশি অনেক মন্দ দিকও রহিয়াছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবন ইন্টারনেটনির্ভর হইয়া পড়িয়াছে। আধুনিক পরিষেবাও এখন প্রধানত অনলাইন-ভিত্তিক। গত দেড় বত্সর ধরিয়া বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে আমাদের যাপিত জীবন অনেকটাই ভার্চুয়াল হইয়া গিয়াছে। আমাদের প্রাণভোমরা হইয়া উঠিয়াছে হাতের মুঠায় থাকা স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য আধুনিক ডিভাইস। ফলে অপরাধী চক্রও তাহাদের নানা ধরনের অপরাধ কার্যক্রম তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করিয়া সম্প্রসারণ করিতেছে সমগ্র বিশ্বে। বাংলাদেশও ইহার বাহিরে নহে। এই দিকে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় সকল পক্ষ যখন ব্যতিব্যস্ত তখন এই সুযোগে সাইবার অপরাধীরা বাংলাদেশে ভয়াবহ সাইবার হামলা চালাইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিয়াছেন পুলিশের সাইবার অপরাধ তদন্ত বিশেষায়িত ইউনিটের কর্মকর্তারা। তাহাদের আশঙ্কা, এই ধরনের হামলা করিতে পারে দেশি-বিদেশি হ্যাকার গ্রুপ। এই সাইবার হামলার হুমকির ঝুঁকিতে রহিয়াছে সরকারের করোনা বিডি, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক, বিকাশ, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি। আশঙ্কা করা হইতেছে, এই হ্যাকার গ্রুপটি করোনা ভাইরাস-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েব-পোর্টাল তৈরি করিয়া মানুষকে টিকা তৈরি ও টিকা প্রদানের বিষয়ে বিভ্রান্ত করিতে পারে। এই ব্যাপারে কিছু দিন পূর্বে সাইবার সতর্কতা জারি করিয়াছে সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম—সিআইআরটি।
সমগ্র বিশ্বেই ইন্টারনেট মানবজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হইয়া পড়ায় এই সংক্রান্ত অপরাধ রোধে ‘সচেতনতা’ই সবচাইতে বড় রক্ষাকবচ। আর এইখানেই আমাদের সবচাইতে বড় ঘাটতি রহিয়া গিয়াছে। সাইবার নিরাপত্তা সেবাদাতা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারেস্কির চলতি বত্সরের প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদনে জানাইয়াছে, ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ভাইরাস আক্রমণের তালিকায় বাংলাদেশ এক নম্বরে রহিয়াছে। আর স্মার্টফোনে ম্যালওয়্যার আক্রমণে রহিয়াছে তৃতীয় স্থানে। আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনেও বাংলাদেশকে সাইবার নিরাপত্তায় অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখা হইয়াছে; কিন্তু কেন? কেন আমাদের এত অধিক ঝুঁকি? তাহার একটি বড় কারণ হইল, বাংলাদেশে পাইরেটেড সফটওয়্যারের বিপুল ব্যবহার রহিয়াছে। দশকের পর দশক ধরিয়া যখন আমরা ইন্টারনেট ছাড়া অফলাইনে কম্পিউটার ব্যবহার করিতাম, তখন পাইরেটেড সফটওয়্যারে ঝুঁকি কম ছিল; কিন্তু এখন ইন্টারনেট ছাড়া এক মুহূর্তও চলা যায় না। এই ক্ষেত্রে পাইরেটেড সফওয়্যার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাইরেটেড সফটওয়্যারযুক্ত কম্পিউটারে বিভিন্ন স্পাইওয়্যার ও ম্যালওয়্যার খুব সহজেই প্রবেশের সুযোগ পায়। প্রতিদিন কী পরিমাণ তথ্য কম্পিউটার এবং স্মার্টফোন হইতে ‘কপি’ হইয়া যাইতেছে, সেই সম্পর্কে অধিকাংশ ব্যবহারকারীই সচেতন নহেন। শুধু কম্পিউটারে নহে, আমাদের দেশের অধিকাংশ ওয়েবসাইটেও পাইরেটেড পাগ-ইনসহ অন্যান্য টুলস ব্যবহার করা হইয়া থাকে। ফলে স্প্যাম, স্ক্যামে পরিপূর্ণ থাকিতেছে ওয়েবসাইটগুলি। অনেক ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটটি আক্রান্ত কি না—তাহাও বুঝিতে পারিতেছেন না ব্যবহারকারী। ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ হইতে দুর্বল। ইহার ফলে বিশেষ করিয়া মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইনে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দ্রুত প্রকট আকার ধারণ করিতেছে।
সমস্যা হইল, উন্নত দেশসমূহ মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা লইয়া যতখানি সচেতন আমাদের মতো স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশ ততখানি চিন্তিত নহে। সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম—সিআইআরটি যখন সাইবার হামলার আশঙ্কা করিয়াছে, তখন ইহাকে সাধারণ সতর্কতা হিসাবে দেখা যাইবে না। শিয়রে সমন দাঁড়াইয়া আছে জানিয়াও আমরা বিপদ অনুধাবন করিতে পারি না। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট হইতে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরির পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৬ সালে এক নির্দেশনায় প্রতিটি ব্যাংককে ২ হইতে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে বলিয়াছিল; কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক তাহা আংশিক বাস্তবায়ন করিয়াছে কিংবা একদমই করে নাই। ব্যাংকিং খাত ছাড়াও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এখনো সাইবার হামলা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নাই। আরো বড় ধরনের ক্ষতি হইবার পর কি আমাদের টনক নড়িবে?
