দেশব্যাপী আলোচনা হচ্ছে সচিব ওপরে না এমপি ওপরে? করোনা মহামারি মোকাবিলায় গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আদেশ জারি করে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরও আগে ২০২০ সালের মে মাসে করোনাকালীন ত্রাণ বিতরণ ও মহামারি মোকাবিলায় ৬৪ জেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয় সিনিয়র সচিব, সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের। তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়াগী লীগ ও জাপার কিছু নেতা। সাবেক আমলা ও বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী যখন বললেন যে, আমলাতন্ত্র ভালো এবং এর বিকল্প সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, এমনকি ফেরাউন ও খলিফারাও বের করতে পারেননি। তার এ মন্তব্যের পর তোফায়েল আহমদ বলেছেন, ‘জনগণ এসব কথা পছন্দ করেন না।’ জনগণ কী পছন্দ করে আর কী করে না, তা কি এ দেশের কেউ ভেবে দেখে আসলে? সরকারি কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না, করলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। তার মানে কি? কে যাবে অনুমতি নিতে? যত অন্যায়ই করুক তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। এ আইন তো এখানেই পাশ করা হয়েছে। উনারা যা বলেন বা বলছেন তা তো সবারই জানা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয়বরাদ্দের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি (২৬.৮ শতাংশ) রাখা হয়েছে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত পাবলিক সার্ভেন্টেদের বেতন-ভাতা ও পেনশনের জন্য। এই খাতে সরকারের বেতন-ভাতা বেড়েছে ২২১ শতাংশ। দেশে জনগণের চিন্তা কে করেন? লাফিয়ে লাফিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনও বাড়ানো হয়, ঘুষের পরিমাণও বাড়ে। এই বৈষম্য সৃষ্টির পুরো ভাগটিই তো সাধারণ জনগণকে পোহাতে হয়!
স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে—জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিদের জনপ্রতিনিধিত্ব করার কথা সেটিতে যখন সমস্যা হয় তখন সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। একটি এলাকা, একটি জেলা ও একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রয়োজন, তেমনি জনপ্রতিনিধিরও প্রয়োজন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাগণ একটি বিশেষ বাছাইপ্রক্রিয়ায় মাধ্যম দিয়ে আসেন। ব্রিটিশরাজ আমাদের দেশসহ পুরো পাক-ভারত উপমহাদেশে একদিকে ‘আশীর্বাদ আর অন্য দিকে অভিশাপ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা আর কেড়ে নিয়েছিল স্বাধীনতা, দিয়েছিল পরাধীনতা। তারা এই উপমহাদেশের জনগণকে কীভাবে শাসন করতে হবে সেজন্য সৃষ্টি করেছিল একদল দক্ষ প্রশাসক। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে ছিল ‘সিএসপি’। তুখোড়, মেধাবী, অলরাউন্ডার শিক্ষার্থীরা হতো সিএসপি অফিসার। তাদের কাছে জনপ্রতিনিধি অর্থাত্ মন্ত্রীরাও থাকতেন কাবু। তাদের মেধা, দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়, তাই যত বড় শক্তিশালী জনপ্রতিনিধিই হোক না কেন তাদের ঘাটাতেন না। প্রশাসনে একধরনের ব্যালান্স ছিল। ফলে, দুর্নীতি কম হতো, কোথাও কোথাও হতোই না। কাজ হতো ধীরে কিন্তু শক্ত। সেই বিষয়টিকেই আমরা ‘আমলাতন্ত্র’ বলে গালি দিই। কারণ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কোনো এলাকার জনগণের কাজ সহজে হতো না, যদিও জনপ্রতিনিধিরা জনপ্রিয়তার স্বার্থে কোনো কাজ তাড়াতাড়ি করতে চাইতেন।
জনপ্রতিনিধিদের জনগণের সঙ্গে চলতে হয়, জনগণের কাছে যেতে হয়, তাদের কাছে পরবর্তী নির্বাচনে (ভোট যদি হয়) ভোটের জন্য যেতে হয়। তাই অনেক সময় ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও জনগণের জন্য, এলাকার জন্য কিছু কাজ যা ঠিকঠাক নিয়মের মধ্যে হয়তো পড়ে না তার পরেও করতে হয়। কারণ, মানুষ চায় তার কাজটি হোক, সেটি নিয়ম মেনে হোক আর নিয়মের বাইরে হোক। যেমন একজন জনপ্রতিধি তার এলাকার একটি বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্ত করতে চান। এমপিওভুক্ত হলে অনেক শিক্ষকের চাকরি হবে, অনেক পরিবার উপকৃত হবে, অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। কিন্তু এমপিওর শর্ত অনুযায়ী সেটি হয়তো এমপিওভুক্তকরণের উপযোগী নয়। এখন, আমলাতন্ত্র যদি শক্তিশালী হয় সেখানে গিয়ে কাজটি আটকে যায় কারণ একজন ভালো আমলা, সত্যিকারের আমলা সেই কাজটি করবেন না। তিনি দেখে শুনে নিয়মমাফিক করবেন। আমরা আসলে কোনটি চাই? আমরা কি মন্ত্রীর ইচ্ছেমতো দ্রুত কাজটি করিয়ে নেব, নাকি সচিব নিয়ম-কানুন দেখে সেটি এমটিওভুক্ত করবেন? মন্ত্রী যদি এটি না পারেন তাহলে একে তো তার প্রেস্টিজের ব্যাপার, দ্বিতীয়ত তিনি এলাকার জনগণের কাছে কী বলবেন?
আবার আমলাদের দিক থেকে (সবাই নয় হয়তো) একটি যুক্তি থাকে যে, আমরা সারা জীবন পড়াশোনা করেছি, শ্রেণিতে, বোর্ডে, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেয়েছি, শক্ত বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় চেয়ার দখল করেছি, কাজেই আমাদের দাপট থাকতেই হবে। যারা পড়াশোনা করেনি, শুধু মিটিং-মিছিল করেছে, গাড়ি ভেঙেছে আর হরতাল করেছে, তাদের সব কথাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে কেন? এখানে আর একটি ব্যাপার আছে পাকিস্তান আমলে সিএসপি অফিসারদের শুধু মেধা ও সৃজনশীলতাই দেখা হতো। এখন এ বিষয়টিও অনেকটা ঘোলাটে হয়ে গেছে। তার একটি কারণ কোটা পদ্ধতি, দ্বিতীয়ত রাজনীতি।
এরশাদ যখন ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি করেন, তার এক দশক পর্যন্ত কিন্তু দেশ পরিচালনা করেছেন সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। ১৯৮২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় বিভিন্ন কলেজে দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারগণ ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা দেখতেন। তারা কোনো কলেজে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকগণ বেরিয়ে আসতেন তাদের অভিবাদন জানানোর জন্য, আর সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাগণও (ক্যাপ্টেন লেভেলের) আগে আগে হাত উঁচু করে সালাম দিতেন অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকদের ‘আসসালামো আলাইকুম স্যার’ বলে। দেখে বিষয়টি ভালো লেগেছিল। নিশ্চয়ই উচ্চপদস্থ অফিসারগণ এভাবেই তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই মেইনটেন করেন। একইভাবে, সিভিল প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও বিভিন্ন কাজে মানবতাবোধ, মানুষকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু যারা মনে করেন যে আমরা ভিন্নগ্রহের ভিন্ন ধরনের বাসিন্দা, সমস্যা তাদেরকে নিয়েই।
আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ এবং জাতীয় পার্টির নেতা ফিরোজ রশীদ সরকারের প্রতি অভিযোগ করেছেন যে, ‘মানুষ মনে করে আমরা যা দিই, এটা প্রশাসনিক কর্মকর্তাই দেন। অথচ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কিন্তু এলাকায় যায়ইনি। এটা কিন্তু ঠিক না। একটা রাজনৈতিক সরকার এবং রাজনীতিবিদদের যে কর্তৃত্ব কাজ, সেটা কিন্তু ম্লান হয়ে যায়।’ একই দিন সংসদ সদস্য ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘এখন রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে—দেশে কোনো রাজনীতি নেই। রাজনীতিশূন্য, কোথাও রাজনীতি নেই। রাজনীতির মঞ্চগুলো আস্তে আস্তে ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাচ্ছে। দেশ চালাচ্ছে কারা?...ডিসিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কথা বলেন, এমপিদের অনুরোধ করতে হয় ডিসিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য। এই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। অথচ এই দেশ স্বাধীন করেছেন রাজনীতিবিদরা।’ সংসদ সদস্যদের আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন, ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, “আমরা সংসদে আছি শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার জন্য।” আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এজন্য কি আমলারা দায়ী? তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই বাস্তব কিছু কারণ আছে।
আসলে দুটো বিষয়ের মধ্যে একটি ব্যালান্স থাকা প্রয়োজন, ভারসাম্য প্রয়োজন। শুধু আমলাদের কাছে সিদ্ধান্ত থাকলে একদিকে যেমন বিলম্ব হয়, অন্যদিকে সব সময় তা জনবান্ধব নাও হতে পারে। আবার, শুধু জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তে যদি কাজ হয়, কাজটি হয়তো দ্রুত শেষ হয় কিন্তু সেটি সব সময় সঠিক বা বৈধ নাও হতে পারে কারণ তাদের তো জনগণকে খুশি করতে হয়। তার চেয়েও বড় কথা হলো পার্টির ব্যাপার আছে। তিনি যে দলের সেই দলের লোকজন চাইবে তাদের পার্টি ক্ষমতায়, কাজেই তারা যা বলবেন তাই করতে হবে ডিসি, এসপি এমনকি সচিবকে। এটি যখন হয়, তখন আর প্রশাসন থাকে না, দেশের কল্যাণ হয় না। এসব ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হলে সাধারণ মানুষ এবং অন্য দলের লোকজন যারা দেশের নাগরিক তারা কিছুটা হলেও সেবা পান। অন্যটি হলে পায় না। সরকারের যে কোনো আদেশ-নির্দেশ জেলা প্রশাসকগণ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে থাকেন। একটি জেলার সার্বিক কর্মকাণ্ড কেন্দ্র থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমেই নেওয়া হয়। এটি ব্রিটিশদের সৃষ্ট। এর চেয়ে উন্নততর কোনো প্রশাসনিক পদ্ধতি আজও আবিস্কৃত হয়নি বিধায় এটিই চলে এসেছে। যদিও স্থানীয় সরকার প্রশাসনব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা হয়েছিল; যেমন এরশাদ সরকার করেছে উপজেলা পদ্ধতি, একই পদ্ধতিতে জেলা চেয়ারম্যান। কিন্তু খুব একটা কার্যকর হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ দেশের কি-পয়েন্টগুলো দখল করে রাখেন। এটি দেখতে একটু কেমন মনে হয় কিন্তু প্রশাসন চালানোর জন্য এটিও একেবারে অগ্রহণযোগ্য বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে মানবতাবোধ, মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে। একটি দেশ পরিচালনার জন্য সবাইকে প্রয়োজন, কেউ কারোর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদিও বাহ্যিকভাবে মনে হয় আলাদা। প্রশাসনে যারা থাকেন তারা কাজের জন্য হয়তো দৃশ্যমান কিছু সুবিধা পান (গাড়ি, বাড়ি, নিরাপত্তা)। মানুষ যখন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তাদের মধ্যে মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত হয়, তখন এসব বিষয় খুব একটা পার্থক্য করে না।
n লেখক :শিক্ষা গবেষক, প্রেসিডেন্ট :ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( ইট্যাব)
