বর্ষীয়ান অভিনেতা দিলীপ কুমার ৯৮ বছর বয়সে গত বুধবার সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ মুম্বাইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার আসল নাম মুহাম্মদ ইউসুফ খান। ১৯৪৪ সালে সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ‘জুগনু’ তার প্রথম বক্স অফিস হিট সিনেমা। ১৯৯৮ সালে শেষবার সিনেমায় অভিনয় করেন এই অভিনেতা। ১৯৬৬ সালে অভিনেত্রী সায়রা বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ‘গোপী’, ‘সাগিনা’ ছবিতে জুটিতে কাজ করেছেন তারা।
দিলীপ কুমার পাকিস্তানের খাইবারে মুহাম্মদ ইউসুফ খান নাম নিয়ে ১১ ডিসেম্বর ১৯২২ সালে একটি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা লালা গোলাম সারওয়ার একজন ফলের ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি মহারাষ্ট্র, পেশোয়ার ও দেওলালিতে ফলের বাগানের মালিক ছিলেন। তার মাতার নাম আয়েশা বেগম। ১৯৩০ সালে শেষ সময়ে, ১২ সদস্যের পরিবার নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। ১৯৪০ সালে দিলীপ কুমার পুনের বাড়ি ছাড়েন, যেখানে তিনি একজন ক্যান্টিন মালিক এবং একজন শুষ্ক ফল সরবরাহকারী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। বোম্বে টকিজের মালিকানাধীন অভিনেত্রী দেবিকা রানী ও তার স্বামী হিমাংশু রাই ১৯৪৪ সালে ‘জোয়ারভাটা’ চলচ্চিত্রটির জন্য দিলীপকে প্রধান চরিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউড শিল্পে প্রবেশ করেন। তার প্রকৃত নাম মুহাম্মদ ইউসুফ খান হলেও হিন্দি লেখক ভগবতি চরণ বর্মা তাকে স্ক্রিন নেম দিলীপ কুমার দেন। দিলীপ কুমার ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও পুশতু ভাষায় কথা বলতে পারতেন।
দিলীপ কুমার ‘ট্র্যাজেডি কিং’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। সত্যজিত্ রায়ের মতে, সর্বশেষ তিনি ছিলেন একজন গুণী অভিনেতা। তিনি ১৯৪৪ সালে বোম্বে টকিজের ব্যানারে ‘জোয়ারভাটা’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পে পদার্পণ করে এতে ছয় দশকের অধিক সময় ধরে বিচরণ করেছেন এবং অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি ছায়াছবিতে।
দিলীপ কুমার অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, যেখানে তারা উভয়েই একসঙ্গে নিজেদের প্রযোজিত প্রতিষ্ঠান থেকে ‘গঙ্গা-যমুনা’সহ সাতটি ছায়াছবিতে অভিনয় করেন। ভারত সরকার ১৯৯১ সালে তাকে পদ্মবিভূষণ পদক দিয়ে সম্মানিত করেন এবং ১৯৯৪ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতি তার অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করেন। রাজ্যসভায় তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য মনোনীত করা হয়। তিনি ১৯৫৪ সালে ফিল্মফেয়ারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার গ্রহণ করা ব্যক্তি এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পাওয়ার ইতিহাস তার ঝুলিতে, যিনি এখন পর্যন্ত মোট আটটি বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন।
দিলীপ কুমার ভারত ও পাকিস্তানের মানুষকে কাছাকাছি আনার প্রচেষ্টায় সক্রিয় ছিলেন।
তাকে ১৯৯৪ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৯৮ সালে তাকে পাকিস্তানের সরকার দ্বারা প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করা হয়। তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার লাভ করেন। কারগিল যুদ্ধের সময় শিব সেনার প্রধান বাল ঠাকরে বলেছিলেন, ভারতীয় মাটির ওপর যে দেশের ভয়ানক আগ্রাসন, সেই দেশের পুরস্কার তার ফেরত দেওয়া উচিত। দিলীপ কুমার এটি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই পুরস্কার মানবিক কার্যক্রমের জন্য আমাকে দেওয়া হয়েছে, যা আমার নিজের জন্য নিবেদিত। আমি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক ফারাক দূর করে বহু বছর ধরে সেতুবন্ধনের জন্য কাজ করেছি, দরিদ্রের সাহায্যের জন্য কাজ করেছি। রাজনীতি ও ধর্ম এই গণ্ডি তৈরি করেছে। আমি দুই দেশকে একত্রিত করার জন্য সংগ্রাম করছি। আমাকে বলুন, কারগিল সংঘাতের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে?
দিলীপ কুমার অভিনেত্রী কামিনী কৌশলের সঙ্গে প্রথম প্রেমে পড়েন, কিন্তু তারা বিয়ে করতে পারেননি। পরবর্তীকালে তিনি রোমাঞ্চকরভাবে অভিনেত্রী মধুবালার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, কিন্তু তাদের পরিবার এই বিয়েতে বিরোধিতা করে। তিনি ১৯৬৬ সালে তার চেয়ে ২২ বছর কম বয়সি ‘সৌন্দর্য রানি’ অভিনেত্রী সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। তিনি ১৯৮০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো আসমা নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন, কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরেই তাদের সংসার শেষ হয়ে যায়।
দিলীপ কুমারকে ব্যাপকভাবে হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একজন ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে সর্বোচ্চসংখ্যক পুরস্কার বিজয়ী হওয়ায় গিনেস বিশ্ব রেকর্ড ঝুলিতে নিজের জায়গা দখল করে নেন। তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে সম্মানিত হন এবং ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মবিভূষণ দেওয়ার ঘোষণা করে আর তা ১৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাকে প্রদান করা হয়। বলিউডের এই ‘বিষাদের মহানায়ককে’ শেষবার পর্দায় দেখা গেছে ১৯৯৮ সালে ‘কিলা’ সিনেমায়।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, সিনে লেখক
