করোনাকালে আর্থিক লেনদেনে স্বস্তি মোবাইল ব্যাংকিং

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২১, ২১:৫৭

করোনা ভাইরাসের প্রকোপে মানুষ একপ্রকার ঘরবন্দি। জরুরি সেবা প্রয়োজনে বের হতে হচ্ছে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য আর্থিক লেনদেন করতে হচ্ছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্যই মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিং নির্ভর হয়ে উঠেছে। এখন প্রণোদনার অর্থ প্রদান, বৃত্তি ও উপবৃত্তিসহ সরকারি বিভিন্ন ভাতা প্রদান, অনলাইনে কেনাকাটা থেকে শুরু করে, ইউটিলিটি বিল প্রদান, চাকরির বেতন পর্যন্ত সবই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। আর যখন খুশি টাকা ওঠানো, টাকা পাঠানো, মোবাইল ফোনে রিচার্জ করার মতো সুবিধা তো রয়েছেই। এখন ব্যাংক থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা নেওয়া কিংবা ব্যাংকে পাঠানোর সুবিধা হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিধি বেড়েছে।

মূলত, ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা কমাতেই মানুষ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে। ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানোর বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি মিলছে মানুষের। দিন যত গড়াচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠছে। বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত মে মাসের মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্যে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৭১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অর্থাত্ প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার ওপরে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা শুরু হওয়ার আট বছরের মাথায় এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৫ হাজার।

তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। আদমশুমারির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে মানুষ এখন সাড়ে ১৬ কোটি। সে হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা অর্ধেকের বেশি। তথ্যমতে, শহরের একজন মানুষের একাধিক কোম্পানির মোবাইল অ্যাকাউন্ট আছে। অবশ্য এ প্রতিবেদনে ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ এর তথ্য নেই। এ তথ্য যোগ হলে লেনদেনের পরিমাণ ও গ্রাহক সংখ্যা আরো বাড়বে। নগদ সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে নগদের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ। আর এজেন্ট রয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএসে লেনদেন কয়েকটি কারণে বেড়েছে। গত মে মাসে ছিল দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব ঈদুল ফিতর। সাধারণত ঈদের সময় মানুষ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেশি লেনদেন করে থাকে। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে এখন ঈদ-বোনাস দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের মধ্যে যেটুকু ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে তার লেনদেনও অনেকাংশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি অনলাইন কেনাকাটা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেতন দিচ্ছে। মানুষ ক্রেডিট কার্ডের বিলসহ ব্যাংকিংয়ের অনেক সেবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিচ্ছে। আর সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন ভাতা, প্রণোদনার অর্থ, বৃত্তি ও উপবৃত্তির অর্থ দেওয়া শুরু হয়েছে। আগে স্বল্প পরিসরে হলেও ইদানীং তার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নানামুখী ব্যবহার আর সহজলভ্য হওয়ার কারণে জনপ্রিয় হওয়ায় গ্রামীণ জনজীবন অনেক সহজ হয়েছে। এ সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই অনেক কাজ করা যাচ্ছে। বাস, ট্রেনের টিকিট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করা যাচ্ছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট যন্ত্রটির মাধ্যমে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব কাজ করা যায় সেগুলো হলো—রেমিট্যান্স পাঠানো, ক্যাশ ইন ক্যাশ আউট, একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যজনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, ইউটিলিটি বিল দেওয়া, মোবাইল ফোনের এয়ার টাইম কেনা, পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট পেমেন্ট, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা, বিমা প্রিমিয়াম, ডিপিএস দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সুবিধাবঞ্চিতদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরের বছর পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। ১৯৯৯ সালে ইউরোপিয়ান ব্যাংকে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। মূলত, স্মার্টফোন উদ্ভাবনের পরে মোবাইল ওয়াপ (ওয়্যারলেস অ্যাপ্লিকেশন প্রটোকল) পদ্ধতির মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মোবাইল অপারেটর ভিত্তিক হলেও বাংলাদেশে এ সেবা ব্যাংকভিত্তিক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ১৫টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। এর বাইরে ডাক বিভাগের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা নগদ ব্যাবসায়িক দিক থেকে দ্রুত এগুচ্ছে।