বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়
চাঁদপুর
১। মহাত্মা গান্ধীর ‘সর্বদয়া ’ আন্দোলন এক সময়ে ভারতের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে জীবনমুখী করেছিল। বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা সিডিএম উক্ত কর্মসূচির অনুকরণ করে
‘শ্রমদান’ কার্যক্রম গ্রহণ করে বগুড়ার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে কাজ করেছে , যা বগুড়ার বিভিন্ন গ্রামে নানামুখী পরিবর্তন সাধন করেছে। এ অঞ্চলে এখন যৌতুক ও বাল্যবিবাহ নেই বললেই চলে। এখানে বহু নারী উন্নয়ন সংঘ এখন জনসংখ্যা রোধ ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পে কাজ করে সমাজ জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
ক) সামাজিক পরিবর্তন কী? খ) বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের একটি কারণ ব্যাখ্যা কর ? গ) ‘সর্বদয়া’ ও ‘ শ্রমদান’ কার্যক্রমের প্রভাবে সৃষ্ট সামাজিক পরিবর্তনের কোন উপাদানের সাথে মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর । ঘ) ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নারীর ভূমিকার পরিবর্তনে সমাজ জীবনে কি প্রভাব ফেলেছে ? বিশ্লেষণ কর।
ক) উত্তর : সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে কোনো জাতির জীবন ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন ।
খ) উত্তর : বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম একটি কারণ হলো শিল্পায়ন ও নগরায়ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর কাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পের প্রসার ঘটেছে। এরমধ্যে পোশাক , চা ,চিনি, চামড়া ,সুতা, তামাক , কাগজ , বিস্কুট, প্রসাধনি , সাবান শিল্প প্রধান। এসব শিল্প প্রসারের ফলে বেকারত্ব ঘোচাতে গ্রামের অনেক দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক নগরমুখী হচ্ছে এবং নগর জীবন গ্রহণ করছে। ফলে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে।
গ) উত্তর : ‘সর্বদয়া ’ ও‘ শ্রমদান ’ কার্যক্রমের প্রভাবে সৃষ্ট সামাজিক পরিবর্তনের শিক্ষা উপাদানের সাথে মিল রয়েছে। সামাজিক পরিবর্তনের একটি বিশেষ উপাদান হলো শিক্ষা। শিক্ষা হলো এক ধরনের সংস্কার সাধন ও বিরামহীন প্রক্রিয়া। সমাজের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার আত্মবিশ্বাস ও বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা জাগ্রত করে। শিক্ষা সমস্ত অন্ধবিশ্বাস , কুসংস্কার , অজ্ঞতা প্রভৃতি থেকে মুক্তি দেয়। যেমন- বাংলাদেশের সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে; যা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। এর ফলে দেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সৃষ্টি হয়েছে বহু সামাজিক নীতি ও আইন। যৌতুক আইন ,পারিবারিক আইন , নারী উন্নয়ন নীতি , বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ,নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন প্রভৃতি সামাজিক সচেতনতার ফসল। নারী শিক্ষা নারীকে বহির্মুখী কর্মগ্রহণ ও চাকরিমুখী করেছে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। এভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা, বাণিজ্য শিক্ষা , সমাজবিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতি সমাজ জীবনে বহু কিছু সৃষ্টি করেছে; যা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ঘ) উত্তর : ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নারীর ভূমিকার পরিবর্তনে সমাজ জীবনে সহায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে শিল্পের ক্রমোন্নতি নারীর সামাজিক জীবন ও মর্যাদার ক্ষেত্রকে প্রভূত পরিবর্তন সাধন করেছে। শিল্পের প্রসার আজ নারীকে গৃহের সীমিত পরিবেশ থেকে বাইরের কর্মমুখর জগতে টেনে এনেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও নারী আগের তুলনায় অনেক অগ্রসর হয়েছে। নারীরা এখন প্রধানমন্ত্রী থেকে বৈমানিক , প্রশাসন থেকে ট্রেন চালক সর্বত্র পুরুষের পাশাপাশি কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া গ্রাম পর্যায়ের নারীরা সরকারি সংস্থা কিংবা বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এ কর্মসংস্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপন , নার্সারি , গরু মোটাতাজাকরণ , ছাগলপালন, মত্স্য চাষ, মধু চাষ, হাঁস-মুরগি পালন , টেইলারিং ,ফলমূলের ব্যবসায় প্রভৃতি। তাদের আয় দ্বারা সংসার চলছে , সন্তানেরা পড়াশুনা করছে এবং পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। আবার পাশাপাশি বহু সামাজিক দায়িত্বও পালন করছে। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটেছে। নারীর ভূমিকার এ পরিবর্তন নারীকে ক্ষমতায়নে ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। অতএব , ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নারীর ভূমিকার পরিবর্তনে সমাজ জীবনে সহায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাতে সন্দেহ নেই।
