করোনা সংক্রমণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সংকট নিরসনে কিছু সুপারিশ

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ২১:১২

মো. তানজিল হোসেন

 

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ, তাদের পরিবার, ছেলেমেয়েরা খুব কষ্টে রয়েছে। সরকারের ট্রেড লাইসেন্স ও শ্রম আইনের অধীনে নেই রিকশাওয়ালা, হকার, দিনমজুর—এরাই মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। আবার যারা মাসভিত্তিক বেতন পান এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন যেগুলো সরকারের ট্রেড লাইসেন্স কিংবা শ্রম আইনের অধীনে নয়, তারাও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অংশ। এ ধরনের কর্মজীবীদের কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা যায়—ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ নেই, বিমা নেই, পেনশন নেই। বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৬-২০১৭ মতে বাংলাদেশে এ ধরনের শ্রমজীবীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫.১ শতাংশ। বর্তমানে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে।

চায়ের দোকানদার, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, বাদাম বিক্রেতা, হকার সবার আয় কমেছে। লকডাউনের ফলে ময়মনসিংহের ছোট দোকানের চা, বিস্কুট বিক্রেতা বলেন, লকডাউনের সময় তার দোকান বন্ধ ছিল এই সময় তার সঞ্চয় থেকে দৈনন্দিন ব্যয়নির্বাহ করতে হতো। তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা তিন জন মাসিক খরচ প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এই লকডাউনের সময় সে তার নিজস্ব জমিতে শাকসবজি ও ফসল ফলানোর জন্য কাজ করে এতে তার কিছু আয় হয়। কিন্তু তাতে তার সংসারের খরচ আসে না। বাধ্য হয়ে তাকে ভোগব্যয় কমাতে হচ্ছে। এতে করে পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে আমিষজাতীয় খাবার তথা—মাছ ও মাংস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এই করোনা মহামারির সময় হার্ড ইমিউনিটি বা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে যার জন্য প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার তথা ফলমূল আমিষ জাতীয় খাবার।

কিন্তু আয় কমে যাওয়ার কারণে এই রকম বৃহত্সংখ্যক মানুষের ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এই অবস্থা হতে পরিত্রাণের উপায় কি? বর্তমানে বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ অন্তর্ভুক্ত কিন্তু আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনির মাধ্যমে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষকে সহায়তা প্রদান করা হবে। তাহলে কারা এই মানুষকে সহায়তা প্রদান করবে। কারা এই সহযোগিতা পাবে। সরকারি নগদ টাকা ও খাদ্যসহায়তা কারা পাবে তার একটি সুনির্দিষ্ট নির্ণায়কের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতে সংশ্লিষ্ট মানুষদের সহায়তা দিতে হবে।

গ্রাম এলাকায় যারা রিকশা, ভ্যানচালক চায়ের দোকানদার হকার তাদের আয় কমে যাওয়ার কারণে তাদের গৃহপালিত গবাদিপশু যেমন—গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, জমির পুরোনো গাছ বিক্রি করে তাদের দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করার চেষ্টা করছে। রাজশাহী শহরের একজন ইজিবাইক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় করোনা পূর্ববর্তী সময়ে তার মাসিক আয় ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। পাঁচ জনের পরিবারে তার মাসিক খরচ হতো প্রায় ১০ হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার টাকা। ইজিবাইক চালিয়ে তার সংসার চলত। লকডাউনের সময় তার আয় হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে আত্মীয়দের সহযোগিতায় তার পরিবারের খরচ চালাতে হচ্ছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর এই করোনাকালীন ১৫ মাসে সরকারি অনুদান দুই বারে ৫ হাজার টাকা ও কিছু খাদ্যসামগ্রী পেয়েছে যা দিয়ে সে দুই মাস মোটামুটি চালাতে পেরেছে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষের প্রায় সবারই একই অবস্থা। তাই সরকারি ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ না করে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী যারা তাদের কাছেই ত্রাণ পৌঁছে দিতে হবে। ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর এই কষ্ট লাঘবের জন্য সমাজের বিত্তশালীদের অবশ্যই এগিয়ে এসে তাদের সহায়তা করতে হবে। শুধু সরকারি সহযোগিতা দিয়ে বিশাল মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হলে তার অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট আছে। অর্থনৈতিক খরচও অনেক বেশি। অতএব করোনা আক্রান্ত হয়ে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে একটু কষ্ট করে হলেও লকডাউনে ঘরে থেকে নিজে ও পরিবারের সবাইকে রক্ষা করতে হবে। করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে লকডাউনের কারণে অবর্ণনীয় কষ্ট, অনাহার, অর্ধাহার থেকে রক্ষা ও জীবনের ঝুঁকি হতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া। সবার টিকা দেওয়া নিশ্চিত হলে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমবে। টিকা সংগ্রহ ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা হতে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। একক কোনো দেশ হতে টিকা ক্রয় করা যাবে না একাধিক দেশ যেমন:ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাজ্য হতে টিকা আমদানি করতে হবে। টিকা আমদানি করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে।

 

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়