শানজানা আলম
সেবারের বর্ষায় মাথা বাঁচানোর আর উপায় রইলো না। জংধরা টিনের চাল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ে। আর সেই সব জায়গায় মা টিনের গামলা পেতে দেন, আধখানা ভরে উঠলে আমি, রুকু কিংবা টুকু সেটা পেছনের দরজা দিয়ে ব্যাড়ে ফেলে দিই। মা ছাড়া আর কারো এই বিষয় নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই। বড় ভাইয়া কলেজে পড়ে, ভালো ছাত্র হওয়ায় তার একটা পড়ার টেবিল আছে। সারাদিন সে মাথা গুজে সাইন স্কয়ার কস স্কয়ার কি সব বিড়বিড় করে পড়তে থাকে। বাইরে বৃষ্টি হলো নাকি ঘরে পানি পড়লো, তাতে তার খুব একটা আসে যায় না।
বাবা প্রাইমারি স্কুল মাস্টারী করেন, বেতন খুবই সামান্য, আমাদের আটজনের সংসার তাতে চলে না। নতুন বই কদাচিত্ কেনা হয়, ভাইয়ার বই আমি, আমার বই রুকু এভাবে পড়তে থাকি আমরা বছরের পর বছর। ভাইয়া খুব ভালো ছাত্র হওয়ায় তার বই হিজিবিজি দাগানো থাকে, আমি পড়ে আরাম পাইনা, তবুও পড়তে হয়। আটজন বলছি কারণ আমার দাদী আর ফুপুও আমাদের সাথে থাকে। ফুপুর বিয়ে হয়েছিলো, কিন্তু সে বিয়ে স্থায়ী হয়নি। অন্য কেউ জায়গা দেয়নি বলে আমাদের সাথে থাকতেন, মায়ের সাথে খুটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতেন আবার খাবার পড়ে দুজন পানের কৌটা নিয়ে বসে গল্প করতেন। আমরা আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম কত মজার মজার সেসব গল্প শোনার জন্য।
মাঝে মাঝে নিষিদ্ধ গল্পের সময় ফুপু বলেন, যারে মনা, যাইয়া একটা সুপারি টুকাইয়া আন তো!
সুপুরি নিয়ে এসে দেখি দুজন মুখে আঁচল গুজে হাসছে, গল্প শেষ!
দাদী ঘুমান সামনের বারান্দায়, একটা চৌকি পাতা, চৌকিতে শীতল পাটি বিছানো, দাদীর বিছানা গোটানো থাকে। আমরা হুড়োহুড়ি করি দাদীর চৌকির উপর। মাঝে মাঝে বড় ভাইয়া জোরে হাক ছাড়ে, পড়তে দিবি না নাকি!
বৃষ্টি নামে ঝমঝম করে। ইটের রাস্তা দিয়ে নেমে বাড়ির সামনে মাটির রাস্তায় দুটো করে ইট দেওয়া, কাদাপানিতে ইটগুলো নড়বড় করে, ‘ফিচকি’ শব্দ করে পানি ছিটে ওঠে, আমরা সেই ইটের উপর দাঁড়িয়েও কাদাপানি ছিটিয়ে খেলি।
সেসব দিনে স্কুল এতো কড়াকড়ি ছিলো না, বাবা দুপুরেই ফিরে আসতেন বৃষ্টি হলে, বাড়ি ফিরে বলতেন, নাহার, রেনি ডে বইলা হেড স্যার ছুটি দিয়া দিলো, খিচুড়ি পাকাবা নাকি?
মায়ের ততক্ষণে রান্না একবার হয়ে গেছে, তার মেজাজ গরম থাকে, গজগজ করতে করতে মোটা চাল আর ছোলা ভাঙা ডাল বাছতে বসেন। দাদীর সময় মতো খেতে হয়, তাই একদফা ভাত ডাল দিয়ে তার খাওয়া হয়ে যায়, আমরা অপেক্ষা করি। ফুপু ভর্তা বাটতে বসে শিল পাটায়।
ঝমঝম শব্দের বৃষ্টিতে ভেজা হাঁসের দল রোয়াকের কোণে দাঁড়ায়। পাশে দাঁড়ায় দুটো কালো রঙের বকরির বাচ্চা, হলুদ রঙা বেওয়ারিশ লালু। আমরা কাউকে তাড়াই না। টুকু ওদের সাথে খুনসুটি করে।
রাস্তার ওইপাড়ে ইউনিয়ন পরিষদের মস্ত পুকুর, মেঘ ডাকলে দুয়েকটা কইমাছের মাথা খারাপ হয়ে যায়, কাঁদায় পেট দিয়ে মোড়াতে মোড়াতে ডাঙায় উঠে পড়ে।
খিচুড়ি রান্না হয়ে যায়, পাশে ইলিশ হয় না। শুকনো মরিচের ভর্তা, বেগুন ভাজা, কপাল ভালো হলে ডিমভাজা, গরম ধোঁয়া উড়ছে প্লেট থেকে, বেলা তিনটা গড়িয়ে যায়। আমরা হুটোপুটি করে খাই। আমাদের সাথে রোয়াকের কোণের অতিথিরাও ভাগ পায়।
দাদী কাঁথা টেনে উঠে বসেন, চিকন সুরে বলেন, আমারে দিও না, এত খাইতে পারি না আমি! তারপরেও মুখ নিচু করে আরাম করে খান, নিচু স্বরে ফুপুর কাছে কাঁচা মরিচ খোঁজেন!!
বিকেলের দিকে একদফা চালভাজা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলে। সন্ধ্যার দিকে বর্ষা ধরে আসে। আমাদের বর্ষাযাপন শেষ হয়, ভেজা সোঁদা গন্ধে।
বড়ভাইয়া এখন ডাক্তার। গুলশানে থাকেন। বাবা মাও থাকেন। দিন কতক আগে দাওয়াত করেছিলেন ভাবী। পোলাও চালের খিচুড়ি ভাইয়া খেতে খেতে বললেন, বিনু তোর ছোটবেলার বর্ষার কথা মনে আছে, সেই যে আমরা মোটা চালের খিচুড়ি আর মরিচভর্তা খেতাম?
আমি মাথা নাড়ি, মনে আছে।
মাকে সেদিন বলেছিলাম, রান্না করেছিলো, সেইরকম আর হয় নারে!! দিনের সাথে সাথে স্বাদও পাল্টে গেলো নাকি!
আমি হাসি, হবে হয়তো! সময় দ্রুত যায়, হয়ত সময়ের সাথে মানুষও অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে।
আমরাও হারিয়েছি। আমাদের বর্ষাযাপন!
