আগুন বিশৃঙ্খলতার মুখোশও পুড়াইয়া দিয়াছে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ২১:৩৭

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুড লিমিটেডের কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনিতে যখন ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট এবং ২০ ঘণ্টা সময় লাগে, তখন বুঝিতে হইবে উহা সাধারণ আগুন নহে। সেই কারখানার আগুন লাগিবার পূর্বে প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করিতেছিলেন। এই শ্রমিকদের মধ্যে অনেক শিশু রহিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষ নিখোঁজ রহিয়াছে, মারাও গিয়াছে অর্ধশতাধিক। মৃতের সংখ্যা কোথায় গিয়া পৌঁছাইবে তাহা এখনো স্পষ্ট নহে। কারখানায় জমাকৃত বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, ফয়েল, কাগজ, রেজিন, ঘিসহ তৈরি করা মালামাল ছিল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। এই কারণে ফায়ার সার্ভিসের তরফ হইতে আগুন নিভাইবার পরও পুনরায় আগুন জ্বলিয়া উঠিতেছিল। ভয়াবহ এই আগুনে লাশগুলি এমনভাবে পুড়িয়া গিয়াছে যে সেইগুলি দেখিয়া চিনা বা শনাক্ত করিবার উপায় নেই। নারায়ণগঞ্জের ঐ কারখানার সম্মুখে এক অভাগা মা বড় বড় কর্মকর্তাকে দেখিতে পাইলেই পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া বলিতেছেন—‘ও স্যার, আমার মায়ের (মেয়ের) হাড্ডিগুলা খুইজ্জা দেন, স্যার।’ কারখানার দাহ্য পদার্থ আর মানুষের লাশের পোড়া গন্ধ যেন সমগ্র দেশের বাতাসকে ভারী করিয়া তুলিয়াছে। আমরা এই মর্মান্তিক অগ্নিদুর্ঘটনায় মারা যাওয়া সকলের আত্মার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করিতেছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য সান্ত্বনা প্রদানের ভাষা আমাদের জানা নাই। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছে জেলা প্রশাসন। এই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন প্রদান করিবে।

কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর অনেকেই তদন্ত কমিটির বিষয়টিকে কেবল রুটিন কাজ বলিয়া মনে করেন। যেই উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, সেই সমস্যাগুলি কেন আগে দেখা হয় না? দাহ্য পদার্থ লইয়া কাজ করা একটি কারখানা যাবতীয় নিয়ম মানিয়া চলিলে তাহাতে কোনো ধরনের বিপদ ঘটিবার কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু সেই নিয়ম মানিবার বিষয়টি যাহারা দেখশুনা করিবার জন্য ছিলেন, তাহারা কী করিয়াছেন? কারখানাটি যে জতুগৃহের মতো বিপজ্জনক অবস্থায় চলিয়া গিয়াছিল, তাহা সরকারের কারখানা পরিদর্শকদের নজরে কি কখনো আসে নাই? কারখানাটির নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য যেই সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ছিলেন, তাহারাও কি তাহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়াছেন? নাকি তাহারা কেবল বেতনভুক্ত কর্মী বলিয়া বিপদের চিহ্নকে পাশ কাটাইয়া গিয়াছেন? তাহাদের তো দায় কম, কিছু ঘটিলে যাবতীয় দায়ভার তো মালিকের কাঁধেই চাপে। শিল্পকারখানা পরিচালনা করা তো এই দেশে অপরাধ নহে। কিন্তু একজন মালিক যখন ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া কারখানা পরিচালনা করেন, তখন এই দেশে প্রতি পদে পদে তাহাকে হোঁচট খাইতে হয়। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রণীত ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে গত বত্সর বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। সরকারের কাজ হইল ব্যবসায়বান্ধব অনুকূল পরিবেশ তৈরি করিয়া দেওয়া। স্পষ্টতই তাহা হইতেছে না। এইখানে কারখানার ক্লিয়ারেন্সসহ যাবতীয় ব্যবসায়সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করিতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করিতে হয়। আমাদের দেশে বহু ক্ষেত্রেই চুরি করা হয় কোনো রূপ রাখঢাক না রাখিয়াই। প্রশ্ন হইল, সরকারি কাজে পদে পদে যদি ঘুষই দিতে হয় তাহা হইলে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের দরকারটা কী? পদ অনুযায়ী তাহাদের একটি করিয়া ছোট-বড় ড্রয়ার করিয়া দিলেই তো হয়।

অনেকে দুঃখ করিয়া বলিয়া থাকেন, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই হাওয়ার উপর দিয়া চলে। অথচ আমরা প্রায়শই গাল ফুলাইয়া বলিয়া থাকি—অমুক অমুক দেশ হইতে আমরা আগাইয়া গিয়াছি, অমুক সালে আমরা উন্নতির বিশেষ কাতারে শামিল হইব। খুব ভালো কথা, কিন্তু এইগুলি বলিবার পূর্বে নিজের প্রকৃত চিত্র বড় আয়নায় একটু ভালো করিয়া দেখিয়া লওয়া প্রয়োজন। তখন উপলব্ধি করা যাইবে, আমরা আসলে কোথায় আছি। জুস কারখানার আগুন আমাদের বিশৃঙ্খলতার মুখোশও বহুলাংশে পুড়াইয়া দিয়াছে।